মরুভূমির বুকে শ্রমের ঘাম: মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাংলাদেশি প্রবাসীদের বর্তমান চালচিত্র

বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় যে রেমিট্যান্স খাতকে, তার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলসমৃদ্ধ এই অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন থেকে শুরু করে সৌদি আরব—মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকণায় মিশে আছে তাদের শ্রম আর ত্যাগের গল্প। তবে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নতুন শ্রমনীতির কারণে বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন এই অঞ্চলের প্রবাসীরা।
অর্থনীতির মূল স্তম্ভ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে, তার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। অদক্ষ শ্রমিক থেকে শুরু করে ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, এবং বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে প্রকৌশলী ও চিকিৎসকরাও এই অঞ্চলে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো টাকায় দেশের গ্রামীণ জনপাদে দালানকোঠা উঠছে, ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য মেরুদণ্ড।
বদলে যাওয়া শ্রমবাজার ও চ্যালেঞ্জ এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া মানেই ছিল নিশ্চিত আয়ের সুযোগ। কিন্তু চিত্রটি এখন পাল্টাচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা এবং করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ‘লৌকালাইজেশন’ বা স্থানীয়করণের দিকে ঝুঁকছে। ওমানে ‘ওমানাইজেশন’ বা কুয়েতের নতুন অভিবাসন নীতির ফলে অনেক বাংলাদেশি চাকরি হারাচ্ছেন। আগে যেসব কাজে প্রবাসীদের নিয়োগ দেওয়া হতো, এখন সেসব কাজে স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে বা অবৈধ হয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
অদক্ষ শ্রমিক ও কম বেতন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ অদক্ষ। ফলে ভারত বা ফিলিপাইনের শ্রমিকরা যেখানে ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান, সেখানে ভাষাগত দক্ষতা ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে বাংলাদেশিরা পিছিয়ে পড়ছেন। এছাড়া ‘ফ্রি ভিসা’র নামে প্রতারণা তো আছেই। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে কাজ না পেয়ে হাজার হাজার তরুণ মরুভূমির বুকে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তবে হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন ও প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ করছে। সৌদি আরবের ‘নিওম সিটি’ বা কাতারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এখনো প্রচুর শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ জনশক্তি (Skilled Manpower) পাঠাতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এখনো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবেই টিকে থাকবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা।











