অল্প আয়েও গড়ুন স্বপ্নের পাহাড়: প্রবাসীদের জন্য বিশেষজ্ঞদের আর্থিক গাইডলাইন

বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যারা প্রতি মাসে অল্প কিছু টাকা সঞ্চয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের জন্য আধুনিক আর্থিক গাইডলাইন হতে পারে জীবন বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি।
সীমিত আয়ের প্রবাসীরা কীভাবে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেশে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলবেন, তা নিয়ে বিশদ পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ছোট আয় থেকেও কয়েক বছরে বিশাল সঞ্চয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের একটি বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। মাসের শেষে ঘর ভাড়া, খাওয়া এবং আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর পর দেশে টাকা পাঠিয়ে তাদের হাতে খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। অনেক সময় সঠিক হিসাবের অভাবে এই অর্থও অকারণে খরচ হয়ে যায়।
ফলে বছরের পর বছর প্রবাসে থেকেও দেশে ফেরার সময় অনেকেরই সম্বল থাকে শূন্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়ের অংক কত, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আপনি কীভাবে তা ব্যবস্থাপনা করছেন।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হলো ‘বাজেটিং’। মাসের শুরুতেই আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ—হোক তা মাত্র ১০ শতাংশ—সঞ্চয়ের জন্য আলাদা করে রাখা উচিত। প্রবাসীদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো মাস শেষে যা অবশিষ্ট থাকে তা জমানো। কিন্তু আধুনিক সূত্র বলছে, ‘আয় বিয়োগ সঞ্চয় সমান সমান ব্যয়’।
অর্থাৎ আগে জমানোর টাকা সরিয়ে রেখে বাকি টাকায় মাস পার করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশের মাটিতে বিলাসী জীবনযাপন এড়িয়ে চলা। দামী স্মার্টফোন, অহেতুক ব্র্যান্ডের পোশাক বা বারবার বাইরে খাওয়ার অভ্যাস ছোট আয়ের প্রবাসীদের বড় শত্রু। এছাড়াও, দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদেরও ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হতে উৎসাহিত করা জরুরি। অনেক সময় পরিবারের অন্যায্য আবদার মেটাতে গিয়ে প্রবাসীরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ফেলে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রবাসীদের জন্য সরকারের রয়েছে বিশেষ বন্ড এবং সঞ্চয়পত্র, যেখানে সাধারণের চেয়ে মুনাফার হার অনেক বেশি।
এছাড়াও, অল্প অল্প করে স্বর্ণ কেনা বা নির্ভরযোগ্য কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে অংশীদার হওয়াও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।
স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের জন্য সঞ্চয়ের সেরা ৫ টিপস:
৫০/৩০/২০ সূত্র অনুসরণ: আয়ের ৫০ শতাংশ মৌলিক চাহিদা (খাবার ও ঘর ভাড়া), ৩০ শতাংশ জরুরি পারিবারিক প্রয়োজন এবং ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ে রাখুন।
অপ্রয়োজনীয় কল ও সাবস্ক্রিপশন হ্রাস: বর্তমানে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অহেতুক ফোন কল বা দামী ডেটা প্যাক সাশ্রয় করে মাসে বড় অংকের টাকা বাঁচানো সম্ভব।
জরুরি তহবিল গঠন: অন্তত তিন মাসের খরচের সমপরিমাণ টাকা একটি জরুরি তহবিলে রাখুন, যাতে আকস্মিক অসুস্থতা বা কাজ না থাকলেও কারো কাছে হাত পাততে না হয়।
বৈধ চ্যানেলে লেনদেন: হুন্ডি এড়িয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে সরকারের ২.৫% নগদ প্রণোদনা পাওয়া যায়, যা আয়ের সাথে বাড়তি যোগফল হিসেবে কাজ করে।
কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি: কাজের ফাঁকে নতুন কোনো দক্ষতা শিখুন। আয়ের একটি অংশ নিজের প্রশিক্ষণে ব্যয় করলে ভবিষ্যতে বড় বেতনের কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রবাস জীবন অনন্তকালের জন্য নয়। আজ আপনি যে কষ্ট করছেন, তার সুফল পেতে হলে সঞ্চয়ের কোনো বিকল্প নেই। ছোট ছোট বিন্দু থেকেই যেমন সিন্ধু হয়, তেমনি আজকের সামান্য সঞ্চয়ই আপনাকে দেশে ফেরার পর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে।











