প্রবাসে থেকেও নিজ গ্রামে সাইফ মিঠুর বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার

জন্মভূমি বাংলাদেশে। প্রবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা থেকেই নিজ জন্মস্থান কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সাইফ মিঠু গড়ে তুলেছেন ‘বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার’ নামের এক অনন্য সামাজিক উদ্যোগ।
লন্ডনের কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও দেশের শিশুদের পাঠাভ্যাস তৈরির এই চিন্তা হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে সাইফ মিঠু লক্ষ্য করেন, উন্নত বিশ্বে শিশুদের শৈশব থেকেই বই পড়ার চমৎকার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প বা সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ার সুযোগ বেশ সীমিত। এই বৈষম্য দূর করতেই তিনি নিজ এলাকার শিশুদের হাতে রঙিন ও জ্ঞানভিত্তিক বই পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি পরিকল্পনা সাজাতে থাকেন কীভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের কাছে সহজ উপায়ে বই পৌঁছানো যায়। শুরুতে সীমিত পরিসরে কয়েকটি স্কুলে বই দিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও খুদে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়ার পর পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় একে একে লালমাই উপজেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
কারাগারের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী আর প্রশাসনিক জটিল কাজের মানসিক চাপ সামলেও সাইফ মিঠু নিয়মিত দেশের কর্মসূচির খোঁজখবর রাখেন। প্রবাসে থেকে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তিনি সরিয়ে রাখেন বই কেনা ও তা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার খরচ মেটাতে। শিশুদের বয়স ও মানসিক বিকাশ উপযোগী বিজ্ঞানের গল্প, রূপকথা, ইতিহাস ও ছড়ার বই বাছাই করে দেওয়া হয় পাঠাগারের এই সংগ্রহে।
বিদ্যালয়গুলোতে আলাদা কোনো ভবন নির্মাণ না করে প্রতিটি ক্লাসরুম বা প্রশাসনিক কক্ষে ছোট ছোট বুকশেলফ কিংবা সুনির্দিষ্ট বইয়ের বাক্স বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে ক্লাসের ফাঁকে কিংবা টিফিনের সময়ে শিক্ষার্থীরা অনায়াসেই বই হাতে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেক স্কউলে এখন নিয়মিত গল্প বলা ও বই পড়ার প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হচ্ছে, যা শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
লালমাইয়ের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকেরা জানান, বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের বই পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির হার ইতিবাচকভাবে বেড়েছে। মোবাইল গেম বা প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে শিশুদের আবার বইমুখী করতে এই সামাজিক প্রয়াস মডেল হিসেবে কাজ করছে।
নিজের মেধা ও অর্জিত অর্থ দিয়ে দেশের শিকড়ে শিক্ষার আলো ছড়ানোর এমন উদাহরণ প্রবাসীদের জন্য অনুকরণীয়। যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত সাইফ মিঠুর এই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় লালমাইয়ের হাজারো শিশুর মধ্যে এখন বই পড়ার নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মে আলোর ছড়াতে প্রবাসীদের এমন ইতিবাচক অংশগ্রহণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।











