লন্ডনের রাজপথ থেকে সিডনির গ্যালারিতে বাংলাদেশের রিকশা ও ট্রাক আর্ট

ঢাকার জ্যামে আটকে থাকা একঘেয়ে রিকশার পেছনের সেই রঙিন চিত্রকর্ম কিংবা ট্রাকের গায়ের উজ্জ্বল লতাপাতা এখন আর কেবল স্থানীয় লোকশিল্প নয়; বরং তা বিশ্বমঞ্চে আভিজাত্যের প্রতীক। লন্ডনের হাই স্ট্রিট থেকে প্যারিসের ফ্যাশন শো—বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি ‘রিকশা আর্ট’ ও ‘ট্রাক আর্ট’ এখন উচ্চকিত প্রশংসা কুড়াচ্ছে। পিক্সেলের এই ডিজিটাল যুগে তুলির আঁচড়ে আঁকা এই দেশীয় ঐতিহ্য বিদেশের ধূসর রাজপথে এক টুকরো প্রাণবন্ত বাংলাদেশ হয়ে ধরা দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের এই অনন্য কারুশিল্পের জয়যাত্রা চোখে পড়ার মতো। ইউনেস্কোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর পালে লেগেছে নতুন হাওয়া। জাপানের মিউজিয়াম থেকে শুরু করে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল, সবখানেই এখন রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রদর্শনী হচ্ছে। বিদেশের রাজপথে যখন কোনো সুসজ্জিত বাংলাদেশি রিকশা চলে, তখন তা কেবল একটি যান থাকে না, হয়ে ওঠে চলমান এক প্রদর্শনী।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পীরা এখন বিদেশের মাটিতে ট্রাক আর্টকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। লন্ডনের রাস্তায় বড় বড় দোতলা বাস কিংবা অভিজাত রেস্তোরাঁর দেয়ালে এখন ট্রাক আর্টের সেই পরিচিত ফ্লোরাল মোটিফ আর টকটকে লাল-হলুদ রঙের বিচ্ছুরণ দেখা যায়। এটি কেবল আলংকারিক শিল্প নয়, বরং বিদেশের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে এক চিলতে অকৃত্রিম মাটির টান।
আন্তর্জাতিক বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড এখন তাদের পোশাকে ও অনুষঙ্গে বাংলাদেশের রিকশা মোটিফ ব্যবহার করছে। নামী ডিজাইনারদের হাত ধরে রিকশার হুডের সেই এমব্রয়ডারি কিংবা টিনের ওপর আঁকা সিনেমার নায়িকার ছবি এখন বিদেশের রানওয়েতে ‘হাই ফ্যাশন’ হিসেবে স্বীকৃত। কেবল পোশাক নয়, ঘরের অন্দরসজ্জা বা দামী কফি মগেও ঠাঁই করে নিচ্ছে আমাদের এই লোকজ ঐতিহ্য।
সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অদম্য প্রাণশক্তি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বংশপরম্পরায় আমাদের শিল্পীরা যেভাবে রঙের ব্যবহার করেন, তা বিশ্ববরেণ্য অনেক চিত্রশিল্পীকেও ভাবিয়ে তোলে। বিদেশের মাটিতে এই শিল্পের সমাদর কেবল শিল্পীদের অর্থনৈতিক মুক্তি দিচ্ছে না, বরং বাংলাদেশকে একটি সৃজনশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
তবে এই বিশ্বজয়ের সুফল ধরে রাখতে হলে আমাদের তৃণমূলের শিল্পীদের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিদেশের বাজারে যখন এই আর্টের দামী পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তখন ঢাকার পুরনো জনপদে কাজ করা মূল কারিগররা যেন বঞ্চিত না হন। রিকশা ও ট্রাক আর্টকে বাণিজ্যিক পণ্যের পাশাপাশি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।











