লন্ডনের হাই স্ট্রিট থেকে প্যারিসের অলিগলিতে বাংলাদেশি কারির জয়ধ্বনি

ভিনদেশের হিমশীতল সন্ধ্যায় ধোঁয়া ওঠা সরু চালের ভাত আর ঝাল ঝাল গরুর মাংসের কারি; এই স্বাদ এখন আর কেবল প্রবাসীদের ঘরোয়া হেঁশেলে সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডনের ব্রিক লেন থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক কিংবা টোকিও, বিশ্বজুড়ে ভোজনরসিকদের রসনা তৃপ্তিতে জাদুর কাঠি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পীরা। সুদূর প্রবাসে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে তারা কেবল শেফ হিসেবে নয়, বরং ‘ফুড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন।
বিশ্বের দরবারে ‘ইন্ডিয়ান কারি’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও খোদ ব্রিটেন বা ইউরোপের কারি শিল্পের প্রায় ৮০ শতাংশেরই নেপথ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পীরা। বিশেষ করে সিলেটি বংশোদ্ভূত শেফদের হাত ধরে কয়েক দশক আগে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। একসময় যারা কেবল জীবিকার তাগিদে ডিশ ওয়াশার বা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, আজ তাদের অনেকেই বিদেশের মাটিতে নামী রেস্তোরাঁর মালিক এবং মিশেলিন স্টার মানের রন্ধনশিল্পী।
রন্ধন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি শেফদের বিশেষত্ব হলো মশলার নিখুঁত ব্যালেন্স। বিদেশের মাটিতে দেশীয় স্বাদের সাথে স্থানীয়দের রুচির যে মেলবন্ধন তারা তৈরি করেছেন, তা এক কথায় অনন্য। এলাচ, দারুচিনি আর তেজপাতার সেই চিরচেনা ঘ্রাণ এখন বিদেশি রসুইঘরের আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
বর্তমান প্রজন্মের প্রবাসী শেফরা কেবল চিরাচরিত কারি বা বিরিয়ানিতে থেমে নেই। তারা এখন ‘ফিউশন ফুড’ বা সৃজনশীল রান্নার মাধ্যমে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। ইলিশের পাতুরিকে ফ্রেঞ্চ স্টাইলে পরিবেশন কিংবা শুঁটকির চাটনিকে আধুনিক গার্নিশিংয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করে তারা প্রমাণ করছেন যে, বাংলাদেশি খাবারও বিশ্বের অন্যতম সেরা ডাইনিংয়ের দাবিদার।
বিদেশের বিভিন্ন রিয়ালিটি শো বা কুকিং কম্পিটিশনে বাংলাদেশি শেফদের সাফল্য এখন নিয়মিত ঘটনা। মাস্টারশেফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তারা যখন লাল-সবুজের অ্যাপ্রন পরে রান্না করেন, তখন তা কেবল এক থালা খাবার থাকে না—তা হয়ে ওঠে হাজার বছরের এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতিনিধি।
তবে এই সাফল্যের পথটি সবসময় মসৃণ নয়। দক্ষ জনবলের অভাব এবং ব্রেক্সিট বা পরিবর্তিত অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপের অনেক রেস্তোরাঁ এখন কর্মী সংকটে ভুগছে। এছাড়া নতুন প্রজন্মের অনেক প্রবাসী মেধাবী তরুণ এই পরিশ্রমসাধ্য পেশার বদলে করপোরেট ক্যারিয়ারের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি পর্যায়ে যদি বাংলাদেশি রন্ধনশৈলীকে একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রোমোট করা যায় এবং দেশে দক্ষ শেফ তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তবে এই কারি ইন্ডাস্ট্রি আমাদের রেমিট্যান্সের আরও একটি বড় উৎস হতে পারে।











