নভেম্বর ৯, ২০২৬
#প্রবাসীর গল্প #প্রবাসীর পরিবার

পরবাসে ভাঙনের সুর: প্রবাসী জীবনে দাম্পত্য সংকট ও আইনি উত্তরণের পথ

বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের আড়ালে অনেক প্রবাসীর পারিবারিক জীবনে দানা বাঁধছে অশান্তির কালো মেঘ। সাংস্কৃতিক ব্যবধান, একাকীত্ব এবং আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে অনেক সাজানো সংসার। তবে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া এবং অধিকার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে প্রবাসে থেকেও বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর কিংবা সন্তানের অভিভাবকত্বের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব।

প্রবাসী জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে পারিবারিক কলহ এখন এক নীরব ব্যাধি। পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে প্রবাসী দম্পতিদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বিদেশের উন্মুক্ত সংস্কৃতিতে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা, পরকীয়া, যৌতুক এবং দীর্ঘ সময় একে অপরের থেকে দূরে থাকা। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী বা স্ত্রী বাংলাদেশে থাকাকালীন প্রবাসী সঙ্গীর অজান্তেই বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন, যা পরবর্তীকালে আইনি জটিলতাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।

প্রবাসী দম্পতিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিচ্ছেদ বা আইনি লড়াই কোন দেশের আইনে হবে? আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, যদি বিয়ে বাংলাদেশে সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ই বাংলাদেশের নাগরিক হন, তবে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ অনুযায়ী বাংলাদেশের আদালতেই এর বিচার হওয়া যুক্তিযুক্ত। তবে বিদেশের আদালতে পাওয়া বিচ্ছেদের ডিক্রি বাংলাদেশে কার্যকর করতে হলে সেটিকে পুনরায় বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতে নথিবদ্ধ করতে হয়।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে দেনমোহর এবং খোরপোষ আদায় করা প্রবাসে এক বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীরা মনে করেন, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের আইন কার্যকর নয়—যা একটি ভুল ধারণা। সমন জারি বা আইনি নোটিশ এখন দূতাবাসের মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগ থাকায় দেশে অনুপস্থিত থেকেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সম্ভব। এছাড়া সন্তানের অভিভাবকত্ব বা ‘চাইল্ড কাস্টডি’র ক্ষেত্রে অধিকাংশ দেশই সন্তানের সর্বোত্তম মঙ্গল বিবেচনা করে রায় দেয়, যেখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বয় প্রয়োজন হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আইনি লড়াইয়ের আগে মানসিক কাউন্সেলিং জরুরি। অনেক সময় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে ইগো বা জেদের বশে প্রবাসীরা চরম সিদ্ধান্ত নেন। বিদেশের বৈরী পরিবেশে পরিবারই যেখানে একমাত্র আশ্রয়, সেখানে আইনি লড়াই শুরুর আগে সমঝোতার পথ খোলা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুনঃ সেনজেনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা: ইউরোপে বাংলাদেশিদের নতুন দিগন্ত 

প্রবাসী জীবনে পারিবারিক সমস্যার আইনি সমাধানের মূল বিষয়সমূহ:

বিবাহ নিবন্ধন: বিদেশের মাটিতে বিয়ে করলেও তা স্থানীয় দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাখা জরুরি, যাতে পরবর্তীতে যেকোনো আইনি সুবিধা পাওয়া সহজ হয়।

বিচ্ছেদের নোটিশ: বিচ্ছেদ কার্যকর করতে হলে অবশ্যই তালাকের নোটিশ স্ত্রী/স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা এবং সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদে পাঠাতে হবে।

দেনমোহর ও খোরপোষ: স্বামী প্রবাসে থাকলেও স্ত্রী বাংলাদেশের আদালতে মামলা করে তার দেনমোহর ও মাসিক খোরপোষ আদায়ের আইনি অধিকার রাখেন।

সন্তানের অভিভাবকত্ব: বিদেশের আদালত অনেক সময় মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে বাবার সাথে সন্তানের নিয়মিত যোগাযোগের অধিকারও আইনত সংরক্ষিত।

পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি: দেশে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলে বিশ্বস্ত কাউকে আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে নেওয়া সম্ভব।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *