বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী তাদের জীবনযাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন। ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নত জীবনের স্বপ্নে তারা বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু প্রবাস জীবন প্রায়শই কঠোর পরিশ্রম, একাকীত্ব এবং সংগ্রামে ভরা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। ২০২৫ সালে সৌদি আরবেই গেছে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি কর্মী, যা মোট মাইগ্রেশনের দুই-তৃতীয়াংশ। সেখানে তারা নির্মাণকাজ, গৃহস্থালী কাজ বা অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত।
অত্যধিক গরম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং কাফালা সিস্টেমের কারণে অনেকে শোষণের শিকার হন। বেতন বিলম্বিত হওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা, অস্বাস্থ্যকর আবাসন এবং দুর্ঘটনায় পড়ে আহত বা মৃত্যুবরণ করা প্রায়শই ঘটে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমানেও লাখো প্রবাসী একই ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে জীবনযাপন তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও সেখানে অত্যধিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং মানসিক চাপ রয়েছে। অনেকে ওভারক্রাউডেড আবাসনে থাকেন, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহায়তার অভাব।
ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় প্রবাসীদের জীবনযাপন ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশ লন্ডনে কেন্দ্রীভূত। সেখানে তারা ব্যবসা, চাকরি বা পেশাজীবী হিসেবে সফল। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটি বিশেজ্ঞরা উন্নত জীবনমান উপভোগ করেন।
অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায়ও শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পান। কিন্তু এখানেও অভিবাসন নীতির কঠোরতা, বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক একীভূত হওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেকে অবৈধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে আন্তঃপ্রজন্মীয় বিভেদ দেখা দেয়।
প্রবাসী নারীদের জীবনযাপন আরও কঠিন। গৃহকর্মী হিসেবে তারা যৌন নির্যাতন, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ২০২৫ সালে নারী মাইগ্রেশন কমেছে, কিন্তু যারা যান তাদের অনেকে ফিরে এসে ট্রমার শিকার হন।
তবু প্রবাসীরা সংস্কৃতি ধরে রাখেন। বিদেশে বাংলা স্কুল, মসজিদ এবং কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলেন। উৎসব পালন করেন, দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। পরিবার থেকে দূরে থেকেও তারা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন।
সরকার প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে সম্মান দিয়েছে এবং বিমা, প্রণোদনা ও সহায়তা বাড়িয়েছে। কিন্তু আরও আইনি সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দরকার।
প্রবাসীদের জীবনযাপন বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল মনে হয়, ভিতরে ততটা কষ্টের। তাদের ত্যাগ দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু তাদের কষ্ট কমাতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।












