নভেম্বর ৯, ২০২৬
#জীবনযাপন #প্রবাসীর গল্প

ভিনদেশের মাটিতে নতুন প্রজন্মকে শেকড় চেনানোর অনন্য লড়াই

যান্ত্রিক প্রবাস জীবনে ইংরেজি বা স্থানীয় ভাষার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মায়ের বুলি। ভিনদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা যেন এক অচেনা জগত। এই ভাষাগত দূরত্ব ঘুচিয়ে প্রবাসীদের সন্তানদের শেকড়ের সন্ধান দিতে বিশ্বজুড়ে এখন দানা বাঁধছে ‘বাংলা শিক্ষা’ আন্দোলন। ঘরোয়া আড্ডা থেকে শুরু করে কমিউনিটি স্কুল—সবখানেই এখন মুখ্য লক্ষ্য একটাই, বিদেশের মাটিতে আগামীর বাঙালিদের মুখে বাংলা ভাষা ফুটিয়ে তোলা।

আরও পড়ুনঃ নীল খাম থেকে পিক্সেলের দূরত্ব; প্রবাসীদের একাকীত্বে ভিডিও কলের প্রলেপ

বিদেশে বসবাসরত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি শিশু অনর্গল ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ বলতে পারলেও নিজের দাদা-দাদীর সাথে কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। এই যোগাযোগহীনতা কেবল ভাষার নয়, বরং সংস্কৃতিরও। এই সংকট অনুধাবন করে নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, লন্ডন এবং সিডনির মতো শহরগুলোতে প্রবাসী অভিভাবকরা জোটবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলেছেন ‘উইকেন্ড বাংলা স্কুল’ বা সপ্তাহান্তের বাংলা পাঠশালা।

এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কেবল বর্ণমালা শেখানো নয়, বরং শিশুদের হৃদয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র এঁকে দেওয়া। যখন একটি শিশু শুদ্ধ উচ্চারণে ‘আমার সোনার বাংলা’ গায় কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস শেখে, তখন সে কেবল একটি ভাষা শেখে না, বরং সে তার পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশকে নিজের ভেতরে লালন করতে শুরু করে।

বর্তমান সময়ের এই উদ্যোগগুলো কেবল ক্লাসরুমের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাংলা শেখাচ্ছেন। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ের পর থেকে জুম বা গুগল মিট ব্যবহার করে ‘ভার্চুয়াল পাঠশালা’র জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। অনেক আইটি বিশেষজ্ঞ প্রবাসী এখন শিশুদের জন্য মজাদার ‘বাংলা লার্নিং অ্যাপ’ বা গেম তৈরি করছেন, যাতে শিশুরা খেলতে খেলতেই যুক্তবর্ণের মতো কঠিন বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভিনদেশের মূলধারার স্কুলগুলোর পড়াশোনার চাপের পর সপ্তাহান্তে আবার বাংলা স্কুলে যাওয়া অনেক শিশুর কাছেই একঘেয়ে মনে হতে পারে। তাই আধুনিক শিক্ষকরা এখন কেবল ব্যাকরণ না পড়িয়ে ছড়া, কমিকস, কার্টুন এবং গল্পের মাধ্যমে বাংলাকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করছেন।

ভাষা রক্ষায় এই ব্যক্তিগত বা কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশে যদি বাংলাকে ‘সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ঐচ্ছিক ভাষা হিসেবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো করা যায়, তবে এই আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পাবে। এছাড়া দেশের সরকারের পক্ষ থেকেও বিদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সহজলভ্য বাংলা পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি।

ভিনদেশের মাটিতে নতুন প্রজন্মকে শেকড় চেনানোর অনন্য লড়াই

পরবাসে জীবনের বিষণ্ণ একাকীত্ব বনাম নাড়ির টানে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *