জাহাজের লস্কর থেকে ‘লন্ডনি’: সিলেটিদের অভিবাসনের অচেনা ইতিহাস

আজ সিলেটের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের যে নিবিড় ও গভীর যোগাযোগ, তার শিকড় কিন্তু বহু বছরের পুরোনো এবং রোমাঞ্চকর। বিমানের যুগে প্রবেশ করার অনেক আগেই সিলেটিদের অভিবাসনের ইতিহাস রচিত হতে শুরু করেছিল বিশাল সমুদ্রে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজের লস্কর বা নাবিক হিসেবে কাজের হাত ধরে। তৎকালীন দূরদর্শী তরুণদের সেই অসমসাহসী সমুদ্রযাত্রাই পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে লন্ডন, বার্মিংহাম ও নিউ ইয়র্কের মতো বিশ্বসেরা শহরগুলোতে।
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সমুদ্রই ছিল বিশ্ব যোগাযোগের মূল মাধ্যম। সিলেট সরাসরি সমুদ্রতীরে না হলেও এখানকার সুরমা-কুশিয়ারাসহ অভ্যন্তরীণ নদীপথের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরের সাথে চমৎকার যোগাযোগ ছিল। এই নদীপথ ব্যবহার করেই সিলেটের প্রদীপ্ত তরুণরা সহজে কলকাতা ডকল্যান্ডে পৌঁছে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজে লস্কর হিসেবে যোগ দিতেন।
সিলেটের যুবকরা নদীপথে পৌঁছে যেতেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা বন্দরে। সেখানে বাষ্পচালিত বিশাল জাহাজে কয়লা টানা, কার্গো লোড করা এবং বাবুর্চির সহকারী হিসেবে ‘লস্কর’ পদে কাজে যোগ দিতেন তারা।
মাসের পর মাস পরিবার বিচ্ছিন্ন জীবন, উত্তাল সমুদ্রের ঝড় এবং তীব্র কায়িক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে লস্কররা দিন পার করতেন। তবে এই কঠিন জীবনই তাদের সামনে উন্মোচন করেছিল ইউরোপ ও আমেরিকার অচেনা সব ভূখণ্ডের দুয়ার।
বিদেশের কোনো বন্দরে জাহাজ নোঙর করলে অনেক লস্কর নেমে যেতেন এবং গোপনে স্থানীয় কারখানা কিংবা ক্যাফেতে কাজ শুরু করতেন। একজন সিলেটি কোথাও স্থায়ী আসন গাড়তে পারলে তিনি দেশের বাড়ি থেকে নিজের ভাই, চাচাতো ভাই কিংবা একই গ্রামের তরুণদের সেখানে নিয়ে যেতেন।
এভাবেই সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘চেইন মাইগ্রেশন’ বলা হয়, তা পূর্ণতা পায়। এই পারস্পরিক সহযোগিতার ফলেই আজ সিলেটের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো ‘লন্ডনি’ বা প্রবাসী সদস্য দেখা যায়। তৎকালীন সময়ে জাহাজের লস্করদের জমানো অর্থ দিয়ে দেশের ভিটেমাটিতে কেনা জমি ও নির্মিত বিশাল অট্টালিকা আজও সিলেটিদের অভিবাসনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।
লন্ডনের ইস্ট এন্ডে নেমে আসা সেই সাধারণ লস্কররা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। বৃটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে রাজনীতি ও মূলধারার অর্থনীতিতে সিলেটিদের অবদান আজ অনস্বীকার্য। অতীত সমুদ্রযাত্রার সেই দুঃসাহসী লস্করদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে বিশ্বময় এক গৌরবোজ্জ্বল প্রবাসী সিলেটি সমাজ।











