প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে কড়া নজরদারির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে বিমানবন্দরে কড়া নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সেবা নিশ্চিত করতে এই জরুরি সুপারিশমালা উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।
আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীরা। অথচ বিদেশে রক্তপানি করা উপার্জন শেষে বা ছুটি কাটাতে যখন তাঁরা দেশের মাটিতে পা রাখেন, তখনই অনেক সময় ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও টার্মিনালে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়। এই দীর্ঘদিনের অভিযোগ নিরসনে এবার জাতীয় সংসদের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি ও বিশিষ্ট সদস্যদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বৈঠকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়, বিমানবন্দরে কোনো প্রবাসী কর্মী যেন হয়রানি বা অহেতুক প্রদেয় সেবায় বিলম্বের শিকার না হন। এ জন্য বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন, ট্রলি সংকট নিরসন এবং সেবাপ্রদানকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ পর্যবেক্ষণে সরাসরি তদারকি ও সিসিটিভি নজরদারি জোরদার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
শুধু বিমানবন্দর সেবা ব্যবস্থার সংস্কারই নয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সরকারি-বেসরকারি নানা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফেরাতেও শক্ত অবস্থান নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। বৈঠকে উত্থাপিত আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্সিং, প্রসেসিং ফি এবং প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড ব্যবহারে যেকোনো অনিয়ম দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
অতএব, মন্ত্রণালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে কর্মকর্তাদের সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়। সামান্যতম গাফিলতি পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে কমিটি।
বৈঠকে সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের হালনাগাদ পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের নির্দিষ্ট সময়সীমায় বিশ্ববাজারের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ৪ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৬ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অর্থাৎ ৩৬,৫৯০ জন নারী কর্মীও রয়েছেন।
বর্তমানে দেশে ২,৮৬০টি অনুমোদিত বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে ২,১৮৭টি সচল রয়েছে, যারা সরকারি বোয়েসেল (BOESL)-এর পাশাপাশি কাজ করছে। এই নিবেদিত কর্মীদের পাঠানো ২৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনৈতিক ভিতকে অভাবনীয় শক্তিশালী করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে প্রায় ২.৮০ বিলিয়ন ডলার বেশি।
বৈঠকে আরও উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আটকে পড়া প্রবাসীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ ইরান থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল ব্যবহারে ১২ জন নারী ও ৮ জন শিশুসহ মোট ১৮৬ জন বাংলাদেশিকে সফলভাবে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিমানবন্দরে সার্বিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও মসৃণ করা সম্ভব বলে মত প্রকাশ করা হয়।











