পরবাসে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তায় দূতাবাস কতটা তৎপর?

বিদেশের মাটিতে নানা আইনি জটিলতা, নিয়োগকর্তার প্রতারণা কিংবা অজান্তে অপরাধে জড়িয়ে বিভিন্ন দেশের কারাগারে বন্দি রয়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। পরবাসের এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকা নাগরিকদের আইনি সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা ও সক্রিয়তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাঁদের ঘামে সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা, তাঁদের একটি বড় অংশ আজ বিদেশের কনস্যুলার সেলের ফাইলবন্দি একেকটি নাম। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ডিটেনশন সেন্টার ও কারাগারে ঠিক কতজন বাংলাদেশি বন্দি আছেন, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান মেলা ভার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভাষা না জানা, স্থানীয় আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা এবং দালালের প্রতারণায় আকামাহীন বা অবৈধ হয়ে পড়ার কারণেই এই প্রবাসীরা বন্দি হন।
সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ দেড় দশকে দেশের মাটিতে এমন বহু দুঃখী মায়ের চোখের জল দেখেছি, যাঁর সন্তান বিদেশের জেলে বছরের পর বছর পচছেন শুধু একটি সঠিক আইনি পরামর্শের অভাবে। অথচ রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকেরা সব সময় প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে মুখে খই ফোটান। কিন্তু সেই যোদ্ধারা যখন বিপদে পড়েন, তখন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোই তাঁদের একমাত্র আশার আলো।
দূতাবাসের আইনি উইং ও বাস্তবতার ফারাক
আইন অনুযায়ী, বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার বা আটক হলে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশন বা দূতাবাস তাঁর পাশে দাঁড়াতে বাধ্য। কনস্যুলার অ্যাক্সেসের মাধ্যমে বন্দির সাথে দেখা করা, তাঁর জন্য দোভাষী বা আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং নির্দোষ হলে তাঁকে মুক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব দূতাবাসের ‘লেবার উইং’ বা আইনি শাখার।
তবে বাস্তব চিত্রটি সব সময় এতটা মসৃণ নয়। প্রবাসীদের বড় অভিযোগ, সংকটের সময় দূতাবাসগুলোর হেল্পলাইনে ফোন করে সাড়া পাওয়া যায় না। জনবল সংকট আর আমলাতান্ত্রিক গাছাড়া ভাব যেন এক চিরন্তন নিয়তি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কারাগার পরিদর্শনের সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করছে, তবুও আইনি লড়াইয়ের চড়া মূল্য চকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক মিশনকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দায়সারা গোছের খোঁজ নেওয়া নয়, প্রতিটি দূতাবাসে স্থায়ী প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ করা এখন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
কারাবন্দিদের আইনি সহায়তায় দূতাবাসের প্রধান করণীয়সমূহ:
দ্রুত কনস্যুলার অ্যাক্সেস: কোনো বাংলাদেশি আটক হওয়া মাত্রই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুততম সময়ে তাঁর সাথে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা।
বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও প্যানেল আইনজীবী: স্থানীয় ভাষার মারপ্যাঁচ বুঝতে প্রতিটি দূতাবাসে সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনজীবীদের প্যানেল গঠন করা।
নথিপত্র ও ট্রাভেল পারমিট সহজীকরণ: সাজা শেষ হওয়া বা সাধারণ ক্ষমা পাওয়া বন্দিদের দ্রুত দেশে ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে ট্রাভেল পারমিট ইস্যু ও টিকিটের ব্যবস্থা করা।
স্বজনদের সাথে তথ্য আদান-প্রদান: দেশে থাকা পরিবারের উদ্বেগের অবসান ঘটাতে বন্দির সর্বশেষ আইনি অবস্থা ও স্বাস্থ্যের আপডেট নিয়মিত পরিবারকে জানানো।
একটি দেশের মর্যাদা নির্ধারিত হয় বিদেশের মাটিতে তার নাগরিকদের সুরক্ষার পরিমাপ দিয়ে। আমাদের প্রবাসীরা কোনো করুণা চান না, তাঁরা চান সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব। দূতাবাসগুলোকে কেবল পাসপোর্ট নবায়ন আর কাগজ সত্যায়নের কেরানিগিরি থেকে বের হয়ে এসে সত্যিকারের সেবাব্রতী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে হবে।
আইনি সহায়তার জন্য সরকারি তহবিলের বরাদ্দ আরও বাড়ানো এবং দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে বহু নিরীহ বাংলাদেশি বিদেশের জেল থেকে আলোর মুখ দেখতে পাবেন। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থে পরিচালিত দূতাবাসগুলো যেন তাদের দুঃসময়ে বিমুখ না করে—২০২৬ সালের এই বদলে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে এটাই আমাদের সর্বাগ্রে প্রত্যাশা।











