প্রবাসীদের জন্য চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’

আগস্ট মাসের শেষ দিকে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সামাজিক সুরক্ষা ও সার্বিক সম্মান নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সাধারণ এটিএম কার্ডের মতো দেখতে এই বিশেষ ডিজিটাল কার্ড ব্যবহার করে প্রবাসীরা বৈধ্য ব্যাংকিং লেনদেনের পাশাপাশি দেশে ফিরে সহজেই বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার সুবিধা উপভোগ করবেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশে ফিরে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও সেবা প্রাপ্তিতে বিলম্বের মুখোমুখি হন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নতুন এই উদ্যোগ প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সব ডিজিটাল সেবাকে একটি সমন্বিত ছাতার নিচে নিয়ে আসবে। প্লাস্টিক স্মার্ট কার্ডের মতো সহজে বহনযোগ্য এই কার্ডটিতে অত্যন্ত সুরক্ষিত ইলেকট্রনিক চিপ ও কিউআর কোড যুক্ত থাকবে।
এই আধুনিক কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ্য ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠাতে পারবেন এবং তার বিপরীতে বিশেষ প্রণোদনা ও পয়েন্ট অর্জন করবেন। দেশে ফেরার পর যেকোনো ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে মুহূর্তেই নগদ অর্থ উত্তোলন এবং রেস্তোরাঁ বা বিপণিবিতানে সরাসরি কার্ড পাঞ্চ করে কেনাকাটা করার সুবিধা মিলবে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর অপ্রয়োজনীয় প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা।
জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য হলেও তাদের সামাজিক স্বস্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষোভ ছিল। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখলেও প্রবাস ফেরত জীবনে তারা সঠিক মূল্যায়ন পেতেন না। নতুন এই প্রবাসী কার্ড চালু হলে সকল প্রবাসীর তথ্য একটি জাতীয় ডেটাবেজে সুসংগঠিত হবে এবং তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সুফল পাবেন।
বৈধ উপায়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে এই ডিজিটাল কার্ডের সাথে দেশীয় সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সরাসরি আইটি নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হচ্ছে। কার্ডধারী প্রবাসীরা ব্যাংকে জমানো আমানতের ওপর অতিরিক্ত সুদের হার, সহজ শর্তে প্রবাসী গৃহঋণ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন। ফলে প্রবাসীদের পরিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাবেষ্টনী আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত হবে।
প্রবাসীদের জন্য অন্যতম বড় দুর্ভোগের জায়গা হলো দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো। অনেক সময় বিদেশে দীর্ঘদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে দেশে নেমে লাগেজ খালাস, নিরাপত্তা তল্লাশি ও যাতায়াত নিয়ে প্রবাসীদের অহেতুক নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। নবপ্রবর্তিত এই কার্ড বিমানবন্দরে প্রদর্শন করলে প্রবাসীরা নির্ধারিত হেল্পডেস্ক থেকে দ্রুততম সময়ে লাগেজ খালাসসহ সব ধরনের অগ্রাধিকারমূলক সহযোগিতা পাবেন।
এছাড়াও দেশে থাকা অবস্থায় কোনো প্রবাসীর পরিবার বা সম্পত্তি কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতায় পড়লে তারা প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে দ্রুত আইনি সহায়তা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা এবং প্রবাসীদের সন্তান বৈধ্য কোটায় স্কুলে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিতেও এই স্মার্ট ডেটা ব্যবহার করা হবে। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ন্যায়সংগত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিএমইটি (BMET) ডেটাবেজে নিবন্ধিত সকল বৈধ প্রবাসী কর্মী পর্যায়ক্রমে এই ডিজিটাল সুবিধা পাবেন। প্রবাসে থাকা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে কিংবা অনলাইনে নির্দিষ্ট সরকারি অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন জমা দিয়ে প্রবাসী কর্মীরা নামমাত্র সময়ে নিজের কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রবাসী কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা, অবস্থানরত দেশ এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর পূর্ব ইতিহাস এই একক ডিজিটাল আইডিতে নিবন্ধিত থাকবে। এর ফলে কোনো কর্মী প্রবাসে কিংবা দেশে কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হলে তার পরিবারকে দ্রুত আর্থিক অনুদান ও বীমা সুবিধা প্রদান করা সরকারের জন্য অনেক সহজ হবে। সরকারের এই প্রাগৈতিহাসিক উদ্যোগকে প্রবাসী সমাজের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।











