দূতাবাসে পাসপোর্ট সেবা সহজ করতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ

বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসে পাসপোর্ট সেবা আরও দ্রুত ও সহজ করতে একযোগে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন মিশনে পাসপোর্ট নবায়ন ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা চলছিল, তা দূর করতে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগের ফলে সময়মতো পাসপোর্ট না পেয়ে প্রবাসে রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের ভিসা বাতিল কিংবা অবৈধ হয়ে পড়ার মতো বড় আইনি ঝুঁকি অনেকটাই দূর হবে।
বিদেশের মাটিতে একজন প্রবাসীর কাছে পাসপোর্ট কেবল একটি জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, বরং তার বৈধভাবে কাজের নিশ্চয়তা ও জীবনের নিরাপত্তা। তবে দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এবং ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে পাসপোর্ট রিইস্যুর আবেদন মাসের পর মাস ঝুলে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে পুরনো এমআরপি থেকে নতুন ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের সময় আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন তথ্যে অমিল পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হতো। সময়মতো নতুন পাসপোর্ট হাতে না পাওয়ায় অনেক কর্মীর ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যেত কিংবা রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের শেষ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হতো। এর ফলে বিপুল সংখ্যক রেমিট্যান্সযোদ্ধা অনিচ্ছাকৃতভাবেই গুরুতর আইনি ঝুঁকিতে পড়ছিলেন।
প্রবাসী কর্মীদের এই মানবিক ও প্রশাসনিক ভোগান্তি লাঘবে দূতাবাসগুলোতে পাসপোর্ট সেবা সরাসরি তদারকির জন্য স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত সেলটি কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। ঢাকায় অবস্থানরত বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনগুলোর মধ্যে যে তথ্য আদান-প্রদানের দূরত্ব ছিল, এই সেল তা সরাসরি সমন্বয় করবে।
মনিটরিং সেলের আওতায় মিশনভিত্তিক প্রতিদিনের আবেদন জমা, অনুমোদনের অপেক্ষমাণ তালিকা এবং পাসপোর্টের ডেলিভারি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক ট্র্যাক করা হবে। কোনো মিশনে অযৌক্তিক বিলম্ব দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা যেমন বাড়বে, তেমনি সেবাগ্রহীতারাও তাদের আবেদনের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি জানতে পারবেন।
দূতাবাসগুলোতে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইনের অন্যতম বড় কারণ ছিল বায়োমেট্রিক ডাটা এন্ট্রির সীমাবদ্ধতা। অনেক মিশনে পর্যাপ্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিশ স্ক্যানার না থাকায় প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক আবেদনকারীকে সেবা দেওয়া যেত। এতে প্রবাসীদের শত শত কিলোমিটার দূর থেকে এসেও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো।
নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে যেসব মিশনে আবেদনকারীর চাপ বেশি, সেখানে আধুনিক বায়োমেট্রিক মেশিনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ঢাকা থেকে প্রিন্ট হওয়া পাসপোর্টগুলো কূটনৈতিক ব্যাগে নিয়মিত বিরতিতে মিশনগুলোতে পাঠানোর পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এর ফলে প্রিন্টিং শেষে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
পূর্বে তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জটিলতায় ফাইল আটকে থাকত। নতুন এই কাঠামোর আওতায় নির্বাচন কমিশনের এনআইডি ডেটাবেজ ও জন্মনিবন্ধন সার্ভারের সাথে দূতাবাসগুলোর কনস্যুলার সফটওয়্যারের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর ফলে তথ্যের ছোটখাটো গরমিল থাকলেও তা অনলাইন যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
প্রবাসীদের কর্মজীবনের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দূতাবাসগুলোতে পাসপোর্ট সেবা আধুনিকায়ন অত্যন্ত কার্যকর পরিবর্তন বয়ে আনবে। যেসব কর্মী এতদিন মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের কারণে ব্যাংকিং লেনদেন বা চিকিৎসা বিমার সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তারা দ্রুত নিয়মিত নাগরিক সুবিধায় ফিরতে পারবেন। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই যৌথ মেলবন্ধন আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।











