ফেসবুক ও টিকটকে কানাডা-ইউরোপের ভুয়া ভিসা প্রতারণা: জালিয়াতি চেনার ট্রিকস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে ভুয়া ভিসা প্রতারণা বাড়িয়ে প্রবাসীপ্রত্যাশী সাধারণ তরুণদের টার্গেট করছে একশ্রেণীর অসাধু দালাল চক্র। বিনা অভিজ্ঞতায় ইউকে, কানাডা বা ইউরোপের রোমানিয়া-ইতালিতে লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ ধরনের জালিয়াতি থেকে রক্ষা পেতে সম্প্রতি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছেন।
আজকাল টিকটক ভিডিও এবং ফেসবুক পেজে ‘স্পনসরশিপ ভিসা’, ‘উইদাউট আইইএলটিএস কানাডা ভিসা’ কিংবা ‘ইউরোপের কনস্ট্রাকশন জব’ লিখে প্রচুর আকর্ষণীয় কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে বড় বড় চোখ ধাঁধানো ছবি, বিদেশি কোম্পানির লোগো এবং পূর্বে যাওয়া ব্যক্তিদের ভুয়া ইন্টারভিউ ভিডিও ক্লিপ যুক্ত থাকে। প্রবাসগামী তরুণরা যাচাই-বাছাই না করে কমেন্টে বা দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলেই ফাঁদে পড়েন।
শুরুতে ফাইল প্রসেসিং ফি বা মেডিকেল ফি বাবদ ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। টাকা দেওয়ার পর ভুয়া অফার লেটার ও ভিসা স্টিকারের ছবি পাঠানো হয়, যা দেখতে হুবহু আসল কাগজপত্রের মতো মনে হয়। পরবর্তী সময়ে বায়োমেট্রিক ও টিকিট কাটার অজুহাতে কিস্তিতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি ফেসবুক পেজ কিংবা ফোন নম্বর বন্ধ করে সটকে পড়ে চক্রটি।
বিএমইটি ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী যেকোনো দেশের ভিসা বা অফার লেটার হাতে পাওয়ার পর সেটির বানান ও ফরম্যাট ভালোভাবে খেয়াল করা উচিত। ভুয়া অফার লেটারে প্রায়শই ব্যাকরণগত ভুল, সরকারি লোগোর ভুল ব্যবহার এবং জেনেরিক ই-মেইল ঠিকানা (যেমন: yahoo.com বা gmail.com) ব্যবহার করা হয়। আসল কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা দূতাবাস কখনোই ফ্রি ই-মেইল অ্যাকাউন্ট থেকে অফিশিয়াল অফার লেটার পাঠায় না।
ভিসা বা জব অফার লেটারে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলে যদি তা সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে না নিয়ে কোনো সাধারণ লিংকে নিয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে তা জাল। অনেক সময় ভুয়া ভিসায় বারকোড বা কিউআর কোড স্ক্যান করলে কেবল কিছু সাধারণ টেক্সট বা প্রার্থীর নাম ভেসে ওঠে, যা একটি স্পষ্ট জালিয়াতির লক্ষণ।
বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট আরএল (RL) নম্বর থাকে। বিএমইটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (bmet.gov.bd) গিয়ে এই নম্বর বা এজেন্সির নাম টাইপ করলেই সংস্থাটি বৈধ নাকি কালো তালিকাভুক্ত তা সহজে দেখা যায়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সামাজিক মাধ্যমে কাজ দেওয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে না।
বিএমইটি স্মার্ট অ্যাপের মাধ্যমেও কাজের নিয়োগানুমতি এবং বহির্গমন ছাড়পত্রের আসল তথ্য নিমিষেই যাচাই করা সম্ভব। কোনো দালাল যদি দাবি করে যে তাদের সরাসরি দূতাবাসে লোক আছে কিংবা বিএমইটি ছাড়াই বিদেশ পাঠানো যাবে, তবে নিশ্চিত থাকুন সেটি একটি জালিয়াতি স্কিম।
ইউরোপ ও কানাডার ভিসা প্রসেসিংয়ের প্রধান দায়িত্ব পালন করে ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global) কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভিসা আবেদনের সময় প্রার্থীকে একটি নির্দিষ্ট ট্র্যাকিং নম্বর বা রেফারেন্স আইডি দেওয়া হয়। আবেদনকারী নিজে ওই অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নিজস্ব ট্র্যাকিং কোড বসিয়ে পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা ট্র্যাক করতে পারেন।
দালালরা যেসব ভুয়া ভিসার পিডিএফ বা ছবি পাঠায়, সেগুলোর ট্র্যাকিং নম্বর ভিএফএসের ট্র্যাকিং পোর্টালে সার্চ দিলে ‘Not Found’ বা ভুল তথ্য দেখায়। তাই অন্য কারো পাঠানো ছবির ওপর ভরসা না করে সরাসরি দূতাবাসের ই-মেইল বা অফিশিয়াল পোর্টালে ভিজিট করা আবশ্যক।
যদি কেউ ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমের দালাল চক্রের মাধ্যমে ভুয়া কাগজের শিকার হয়ে থাকেন, তবে কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ থানায় জিডি এবং সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটে লিখিত অভিযোগ জানানো উচিত। বিএমইটির লিগ্যাল উইং এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কেও প্রতারক এজেন্সির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা যায়।
এ ছাড়া যেকোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেল বা অফিশিয়াল রসিদ ছাড়া নগদ অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকা শ্রেয়। সচেতনতা ও সঠিক অফিশিয়াল তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই কেবল এই ডিজিটাল ভিসা জালিয়াতি থেকে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব।











