শুধু রেমিট্যান্স নয়, স্টার্টআপে প্রবাসী বিনিয়োগ বদলে দিচ্ছে দেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্টার্টআপে প্রবাসী বিনিয়োগ এখন এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও, বর্তমানে এর ধরন বদলাচ্ছে।
প্রবাসীরা এখন কেবল পরিবারের খরচ মেটাচ্ছেন না; বরং তারা সরাসরি দেশের আইটি, এগ্রো-টেক ও ই-কমার্স খাতের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে নিজেদের মূলধন বিনিয়োগ করছেন।
প্রবাসীরা একটা সময় তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত অর্থ কেবল জমি কেনা, ফ্ল্যাট বুকিং বা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশিদের চিন্তাভাবনায় এবং বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট ধরনে এখন বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। তারা অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, অলস সঞ্চয়ের পাশাপাশি আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেশের টেকসই ও লাভজনক খাতে খাটানো এখন সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির অসামান্য কল্যাণে তারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসেই দেশের প্রতিভাবান উদ্যোক্তাদের সাথে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতিকে অভাবনীয়ভাবে শক্তিশালী করছে।
সবচেয়ে বেশি আগ্রহ এবং বিপুল পরিমাণ মূলধনের প্রবাহ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে সরাসরি তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি নির্ভর সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোতে। নতুন ফিনটেক কোম্পানি, স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপ, লজিস্টিকস এবং বড় মাপের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান পছন্দের জায়গা হিসেবে ইতিমধ্যে পরিগণিত হয়েছে।
প্রবাসীরা উন্নত বিশ্বের আধুনিক ব্যবসায়িক মডেলগুলো খুব কাছ থেকে প্রতিনিয়ত দেখার কারণে তারা পরিষ্কারভাবেই জানেন যে ঠিক কোন ধরনের উদ্যোগ দেশে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে। তাদের এই আন্তর্জাতিক কাজের অভিজ্ঞতা এবং কর্পোরেট মেন্টরশিপ দেশীয় প্রতিভাবান স্টার্টআপগুলোকে খুব দ্রুত বিশ্বমানের করে তুলতে দারুণভাবে সাহায্য করছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতের অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিখাতেও এখন আধুনিক প্রযুক্তির জাদুকরী ছোঁয়া লেগেছে। স্মার্ট এগ্রিকালচার, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, অর্গানিক ফার্মিং এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মতো চমৎকার এগ্রো-টেক উদ্যোগগুলো প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তায় দ্রুত প্রসার লাভ করছে।
আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিজ্ঞানসম্মত বাজারজাতকরণের ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পেয়ে দারুণভাবে লাভবান হচ্ছেন। ঠিক একইভাবে বিনিয়োগকারী প্রবাসীরাও তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের একটি সন্তোষজনক রিটার্ন পাচ্ছেন, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নতুন নতুন স্টার্টআপগুলো নিজেদের আকার বড় করার সাথে সাথে সমগ্র দেশে বিপুল পরিমাণ নতুন কর্মসংস্থানের এক অভূতপূর্ব সুযোগ প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। একটি নতুন কোম্পানি সফলভাবে দাঁড়ানোর মানেই হলো সেখানে একদল তরুণ মেধাবী গ্র্যাজুয়েটের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কাজের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। এই গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব কমার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেইন রোধ করাও অনেকাংশেই সম্ভব হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে দেশি প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অর্থায়ন আমাদের সামগ্রিক গ্রামীণ ও শহরের অর্থনীতিকে অনেক বেশি স্বাবলম্বী করে তুলছে।
স্টার্টআপে প্রবাসী বিনিয়োগ এর এই অভিনব ও সময়োপযোগী ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।











