ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বাড়ল

বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রবাসী আয় যোদ্ধা ও ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় আগের প্রান্তিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। খরচ বাড়ার ফলে অনেক প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেল ছেড়ে হুন্ডির মতো অবৈধ উপায়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা ১ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে ১৭ ডলার ৮০ সেন্ট খরচ করতেন। কিন্তু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এসে এই ব্যয় একলাফে ১৮ ডলার ২০ সেন্টে উঠে গেছে। অর্থাৎ সামান্য তিন মাসের ব্যবধানে প্রতি ১ হাজার ডলার লেনদেনে সরাসরি ৪০ সেন্ট অতিরিক্ত মাশুল গুণতে হচ্ছে প্রবাসীদের।
প্রাথমিক দৃষ্টিতে এই ৪০ সেন্ট খুব বড় অংক মনে না হলেও, সার্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর হিসাব করলে এর টাকার অংক দাঁড়িয়েছে শত কোটি টাকার উপরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত আয়ের ওপর এই বাড়তি ফির প্রভাব বেশ স্পষ্ট।
কেন হঠাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের এই অতিরিক্ত মাশুল গুণতে হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বিদেশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো তাদের সেবা মাশুল বৃদ্ধি করেছে। এর বাইরে অনেক দেশে রেমিট্যান্স স্থানান্তরের ওপর নতুন করে ফি ও কর আরোপ করা হয়েছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারে বড় ধরণের অস্থিরতা দেখা গেছে। প্রবাসীরা যে দেশ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন, সেখানকার মুদ্রা ও ডলারের মধ্যকার ব্যবধানের কারণেও প্রবাসীদের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বাড়ায় সাধারণ প্রবাসীদের মাঝে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কম আয়ের শ্রমিকদের জন্য প্রতি ডলারের ফি সাশ্রয় করা অত্যন্ত জরুরি। যখনই বৈধ পথে মাশুল বাড়ে, তখনই অবৈধ হুন্ডি চক্র প্রবাসীদের কম খরচে ও দ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে উৎসাহিত করতে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেবা ফি বৃদ্ধি পেলে সেই প্রণোদনার সুফল কমে যায়। ফলে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পায়, যা দেশের অফিশিয়াল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য মোটেও সুখকর নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এই ফি পুনর্নির্ধারণ করা। প্রয়োজনে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে বিদেশে নিজস্ব রেমিট্যান্স হাউজ সম্প্রসারণে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমে আসে।
তাছাড়া রেমিট্যান্স প্রেরণে ডিজিটালাইজেশন ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সহজ করা গেলে প্রসেসিং ফি অনেক নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতে হলে প্রবাসীদের কম খরচে ও নিরাপদে অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি।











