কেন নোবেলজয়ীদের পদচারণায় মুখরিত স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়?

জার্মানি ও ফ্রান্সের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলা রাইন নদীর তীরে অবস্থিত স্ট্রাসবুর্গ শহরটি কেবল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জন্য নয়, বরং বিশ্ব উচ্চশিক্ষার এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে সমাদৃত। ১৫৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় (University of Strasbourg) বর্তমানে ১৮ জন নোবেল বিজয়ীর এক গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার বহন করছে, যা একে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ বিদ্যাপীঠ নয়; এটি মূলত ইউরোপীয় সংস্কৃতির এক মিলনস্থল। রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ফরাসি ও জার্মান—উভয় শিক্ষার ঐতিহ্যের মিশ্রণে এক শক্তিশালী অ্যাকাডেমিক ভিত তৈরি করেছে। লুই পাস্তুর থেকে শুরু করে আলবার্ট সোয়াইটজার—বিশ্বের গতিপথ বদলে দেওয়া বহু মনীষীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইটের পাঁজরে।
২০০৯ সালে স্ট্রাসবুর্গের তিনটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় (লুই পাস্তুর, মার্ক ব্লচ এবং রবার্ট শুম্যান) একীভূত হওয়ার পর এটি ফ্রান্সের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই একীভূতকরণ স্রেফ প্রশাসনিক ছিল না, বরং এটি ছিল বিজ্ঞান, মানবিক ও আইন শিক্ষার এক অনন্য সমন্বয়, যা আজ পুরো ইউরোপের জন্য একটি রোল মডেল।
স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এর রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদে। এখানকার রসায়ন বিভাগটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণাগারগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়। জিন-মারি লেন এবং মার্টিন কারপ্লাস-এর মতো নোবেলজয়ীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণাগুলো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ন্যানোটেকনোলজির দিগন্ত উন্মোচন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে ইউরোপিয়ান লিগ অফ রিসার্চ ইউনিভার্সিটিজ (LERU)-এর একটি সক্রিয় সদস্য। এর অর্থ হলো, এখানকার শিক্ষার্থীরা কেবল একটি ডিগ্রি পান না, বরং তারা সরাসরি ইউরোপের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও আইনে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়মিতভাবে বিশ্বের প্রথম সারিতে নিজের অবস্থান বজায় রাখছে।
স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য:
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৫৩৮ সাল (জোহানেস স্টুরম কর্তৃক)।
নোবেল ঐতিহ্য: এ পর্যন্ত ১৮ জন নোবেল বিজয়ী এই প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষার্থী বা শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
গবেষণা অবকাঠামো: ৭২টি গবেষণা ইউনিট এবং ফ্রান্সের জাতীয় গবেষণা সংস্থা (CNRS)-এর সাথে নিবিড় সহযোগিতা।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ: প্রায় ৫২,০০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ শতাংশই বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা।
অবস্থান: স্ট্রাসবুর্গ, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক শহর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম রাজধানী।
বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী শিক্ষার্থীদের জন্য স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে মেধা বিকাশের শ্রেষ্ঠ প্রাঙ্গণ। যুক্তরাজ্যের আকাশছোঁয়া টিউশন ফি কিংবা উত্তর আমেরিকার ভিসা জটিলতার বিপরীতে ফ্রান্সের এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। সরকারি ভর্তুকির কারণে এখানে পড়ার খরচ যেমন কম, তেমনি জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত উন্নত।
স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে এখানে ইংরেজি মাধ্যমে প্রচুর বিশ্বমানের প্রোগ্রাম রয়েছে। বিশেষ করে যারা মলিকুলার বায়োলজি, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা ইউরোপীয় স্টাডিজ নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য স্ট্রাসবুর্গ এক অনন্য গন্তব্য।
এখানকার পড়াশোনা শেষ করে সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থায় ইন্টার্নশিপ বা চাকরির সুযোগ বাংলাদেশি মেধাবীদের জন্য এক সোনালী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।











