‘ডিগ্রি ইকুইভ্যালেন্সি’ সংকটে কি আপনার ক্যারিয়ার?

বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরার পর অনেক মেধাবী তরুণই এক অদৃশ্য দেয়ালে হোঁচট খানআর তা হলো ‘ডিগ্রি ইকুইভ্যালেন্সি’ বা সনদের সমতাকরণ। সরকারি চাকরি বা উচ্চতর গবেষণায় যোগ দিতে বিদেশি ডিগ্রিকে দেশীয় কারিকুলামের সমমান করা বাধ্যতামূলক। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই আইনি প্রক্রিয়াটি না জানা থাকলে আপনার বহু মূল্যবান ডিগ্রিটি দেশে অচল হয়ে পড়তে পারে।
বিদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ক্রেডিট আওয়ার, পাঠ্যসূচি এবং গ্রেডিং পদ্ধতির ভিন্নতা থাকে। যেমন, ইউরোপের অনেক দেশে তিন বছর মেয়াদী স্নাতক ডিগ্রি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের চার বছর মেয়াদী অনার্সের সমান কি না, তা নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
একইভাবে বিদেশি মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিল (যেমন বিএমডিসি) থেকে সমতা নিশ্চিত করতে হয়। এই যাচাই-বাছাইয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো ডিগ্রির গুণগত মান এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশি ডিগ্রির সমতাকরণ প্রক্রিয়াটি মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। আগে এই কাজের জন্য মাসের পর মাস ইউজিসির বারান্দায় ঘুরতে হলেও, এখন অনলাইনেই প্রাথমিক আবেদন সম্পন্ন করা যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, কেবল ডিগ্রি থাকলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়টি ওই দেশের সরকার বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কি না, সেটিই আগে যাচাই করা হয়। বিশেষ করে অনলাইন বা ডিসট্যান্স লার্নিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত ডিগ্রির ক্ষেত্রে সমতা পাওয়া বেশ জটিল হতে পারে।
সমতাকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল নথিপত্র বা ট্রান্সক্রিপ্ট। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ডিগ্রিটি যে দেশে অর্জন করা হয়েছে, সেই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে সত্যায়ন করার প্রয়োজন পড়ে। এছাড়া স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি ডিগ্রির ক্ষেত্রে থিসিস বা গবেষণাপত্রের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়। ইউজিসির একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি এই পাঠ্যক্রম বিশ্লেষণ করে সমমান সনদ প্রদান করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বায়নের এই যুগে সমতাকরণ প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত ও সহজ করা জরুরি। অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রবাস ফেরত মেধাবীরা দেশে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বর্তমানে ও-লেভেল বা এ-লেভেলের মতো স্কুল পর্যায়ের সনদের সমতাকরণ প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে।
বিদেশি ডিগ্রির সমতাকরণ করতে যা যা প্রয়োজন:
অনলাইন আবেদন: ইউজিসির নির্ধারিত পোর্টালে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করতে হবে।
মূল সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট: বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইস্যু করা মূল সার্টিফিকেট এবং নম্বরপত্রের স্ক্যান কপি ও মূল কপি।
পূর্ববর্তী সনদের সমতা: যদি আপনি স্নাতকোত্তর সমতা করতে চান, তবে আপনার স্নাতক ডিগ্রিটি যদি বিদেশি হয়, সেটিরও সমমান সনদ থাকতে হবে।
ভেরিফিকেশন মেইল: সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউজিসিকে সরাসরি ইমেইলের মাধ্যমে সনদের সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়।
নির্ধারিত ফি: ব্যাংক ড্রাফট বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে সমতাকরণ ফি জমা দিতে হবে।
বিদেশের ডিগ্রি দেশে কাজে লাগানোর প্রথম সোপানই হলো এই সমতাকরণ। যারা ভবিষ্যতে দেশে সরকারি বিসিএস পরীক্ষা বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উচিত দেশে ফেরার সাথে সাথেই এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা। যথাযথ তথ্যের অভাবে শেষ মুহূর্তে আবেদনের সময় যেন কোনো জটিলতা তৈরি না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।











