স্টুডেন্ট ভিসার জন্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট; কত মাসের ওল্ড ফান্ড দেখাতে হবে?

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো সঠিক ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রদর্শন করা। অনেক শিক্ষার্থীই স্পন্সর বা ওল্ড ফান্ড সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে ভিসা রিজেকশনের মুখোমুখি হন। কোন দেশের জন্য কত টাকার ফান্ড এবং তা কত দিন ব্যাংকে রাখতে হবে, সেই হিসাব জানা না থাকলে ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন বিভাগ নিশ্চিত হতে চায় যে, একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও সেখানে থাকার খরচ চালানোর মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যাতে মাঝপথে টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ না করে বা অবৈধ কর্মসংস্থানে জড়িয়ে না পড়ে, সেটাই যাচাই করা হয় এর মাধ্যমে। তাই শুধু একাউন্টে টাকা থাকলেই চলে না, সেই টাকার পেছনের বৈধ উৎসগুলোও কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। যদি ইমিগ্রেশন অফিসারদের মনে কোনো সন্দেহ জাগে, তবে পুরো প্রোফাইল ভালো হওয়া সত্ত্বেও ভিসা বাতিল হতে পারে।
ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ‘ওল্ড ফান্ড’ বা কত দিন যাবত টাকাটি একাউন্টে জমা আছে তা একটি বড় ফ্যাক্টর। দেশভেদে এই নিয়মে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায়, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিখুঁতভাবে জানা উচিত। অসচেতনতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভুল সময়ে ভিসা ফাইল সাবমিট করে বসেন এবং রিজেকশন পান।
যুক্তরাজ্যের (UK) জন্য নিয়মটি বেশ কড়া এবং সুনির্দিষ্ট। সেখানে আবেদনের ঠিক আগের অন্তত ২৮ দিন যাবত পুরো টাকা একাউন্টে থাকতে হবে। এই ২৮ দিনের মধ্যে একাউন্টের ব্যালেন্স এক পয়সাও কাঙ্ক্ষিত অঙ্কের নিচে নামা চলবে না। কানাডার ক্ষেত্রে সাধারণত বিগত ৪ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হয়। যদিও কানাডায় এখন লিভিং কস্টের জন্য জিআইসি (GIC) হিসেবে ২০,৬৩৫ কানাডিয়ান ডলার আগেই পাঠিয়ে দিতে হয়, তবুও মূল অ্যাকাউন্টের লেনদেন ট্র্যাক করা হয়।
অন্য দিকে, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে ওল্ড ফান্ডের নিয়ম আরও কিছুটা দীর্ঘ। সাধারণত অন্তত ৩ মাস পুরনো ফান্ড দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, অথবা টাকাটি যদি নতুন হয় তবে তার সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য প্রমাণ দেখাতে হয়। ইউএসএর ক্ষেত্রে ওল্ড ফান্ডের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ না থাকলেও, একাউন্টে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকা জমা হওয়াকে তারা নেতিবাচকভাবে দেখে।
ব্যাংকে কত টাকা দেখাতে হবে তার সহজ সমীকরণ হলো: আপনার প্রথম বছরের সম্পূর্ণ টিউশন ফি + প্রথম বছরের লিভিং কস্ট (থাকা-খাওয়ার খরচ) + বিমান টিকিট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। এই তিনটির যোগফলই হলো আপনার ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ফান্ড। তবে ইমিগ্রেশনকে নিরাপদ রাখতে এই অঙ্কের চেয়ে আরও অন্তত ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা বেশি দেখানো বুদ্ধিমানের কাজ।
বর্তমানে ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, কানাডার জন্য টিউশন ফি এবং নতুন লিভিং কস্ট মিলিয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা দেখাতে হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে যদি লন্ডন বা লন্ডনের বাইরে পড়াশোনা হয়, সেই অনুযায়ী টাকার পরিমাণ ভিন্ন হয়। লন্ডনের ভেতরে হলে প্রতি মাসে ১,৫২৯ পাউন্ড এবং বাইরে হলে ১,১৭১ পাউন্ড হিসেবে ৯ মাসের লিভিং কস্ট হিসাব করতে হয়, যার সাথে যুক্ত হয় এক বছরের টিউশন ফি। অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের ওপর ভিত্তি করে এই ফান্ডের পরিমাণ ৩৫ থেকে ৫০ লক্ষ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।
ইমিগ্রেশন বিভাগ টাকার পরিমাণের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় সেই টাকাটি কোথা থেকে এলো তার ওপর। হঠাৎ করে কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নিয়ে একাউন্টে টাকা জমা দিলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। যদি স্পন্সর আপনার বাবা বা মা হন, তবে তাদের আয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যেমন চাকরির পে-স্লিপ, ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল, ব্যবসার লাইসেন্স বা জমির বিক্রয়লব্ধ দলিলের কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ব্যাংক একাউন্টের লেনদেন যেন স্বাভাবিক এবং আপনার পরিবারের বার্ষিক আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রায় সব দেশের স্টুডেন্ট ভিসার জন্যই ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআর গ্রহণযোগ্য। তবে এটি যেন ক্যাশ বা লিকুইড করা সম্ভব হয় এবং ব্যাংক থেকে এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট ও স্টেটমেন্ট নেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় যেমন বাবা, মা, ভাই, বোন বা দাদা-দাদি সাধারণত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য স্পন্সর। চাচা, মামা বা দূর সম্পর্কের কেউ স্পন্সর হতে চাইলে তাদের সাথে আপনার সম্পর্কের দৃঢ়তা এবং কেন তারা আপনাকে অর্থায়ন করছেন, তার শক্তিশালী আইনি ব্যাখ্যা দিতে হবে।
যেকোনো তফসিলি ব্যাংক থেকে অনুমোদিত এডুকেশন লোন বা শিক্ষা ঋণকে বিশ্বের যেকোনো দেশই বৈধ ফান্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেক্ষেত্রে লোনের অনুমোদন পত্র এবং ডিসবার্সমেন্ট লেটার ভিসার নথির সাথে যুক্ত করতে হয়।











