নভেম্বর ৯, ২০২৬
#আইনি সহায়তা #এডিটর্স পিক #প্রিয় বাংলাদেশ

দেশের জমি নিয়ে চিন্তিত? জেনে নিন ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’র সঠিক আইনি নিয়ম

দেশের জমি নিয়ে চিন্তিত? জেনে নিন ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’র সঠিক আইনি নিয়ম

প্রবাসে থেকেও দেশের মাটিতে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখতে এবং যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে প্রবাসীদের জন্য ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া না জানার কারণে অনেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রতিনিয়ত জালিয়াতি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, যা একটু সচেতন হলেই রোধ করা সম্ভব।

লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক জীবিকার তাগিদে বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে থাকা জমিজমা, ফ্ল্যাট কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের পক্ষে সরাসরি সম্ভব হয় না। এই বাস্তব সমস্যা সমাধানের আইনি উপায় হলো আমমোক্তারনামা। এর মাধ্যমে একজন প্রবাসী দেশে থাকা তার কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয় বা ব্যক্তিকে নিজের অনুপস্থিতিতে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, খাজনা প্রদান বা মামলা পরিচালনার আইনি ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন।

তবে এই আইনি দলিলটি তৈরির ক্ষেত্রে সামান্য অসাবধানতা কিংবা নিয়ম না মানার কারণে বহু প্রবাসী তাদের সারাজীবনের উপার্জনে গড়া সম্পত্তি হারাচ্ছেন। অনেক সময় দেখা যায়, অতি বিশ্বাসী আত্মীয়ও ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে সম্পত্তি আত্মসাৎ করছে। তাই আইনি মারপ্যাঁচ এড়াতে এবং নিজের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে সরকারের নির্ধারিত সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

দূতাবাস থেকে রেজিস্ট্রি অফিস:

বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর করতে হলে প্রধানত ‘দি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অ্যাক্ট, ২০১২’ এবং ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা, ২০১৫’ অনুসরণ করতে হয়। অনেকেই মনে করেন, শুধু একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে দিলেই কাজ শেষ—যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

প্রথমত, প্রবাসীকে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনে উপস্থিত হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে আমমোক্তারনামা দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর দূতাবাস এটি সত্যায়ন করে বাংলাদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পুনরায় সত্যায়নের পর, যে জেলায় সম্পত্তি অবস্থিত সেই জেলার ডিসি (রেভিনিউ) অফিস থেকে প্রয়োজনীয় রাজস্ব বা স্ট্যাম্প ডিউটি পরিশোধ করতে হবে। সবশেষে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি করলেই তা পূর্ণাঙ্গ আইনি বৈধতা পায়।

আমমোক্তারনামা প্রস্তুতের মূল আইনি দিকগুলো:

  • দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিতি: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দাতা (প্রবাসী)-কে অবশ্যই পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় নথিসহ স্বশরীরে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উপস্থিত হতে হবে।

  • নির্দিষ্ট মেয়াদের উল্লেখ: দলিলে ক্ষমতার পরিধি এবং মেয়াদের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন: দূতাবাস থেকে সত্যায়িত হওয়ার পর দলিলটি বাংলাদেশে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার শাখা থেকে চার মাসের মধ্যে পুনরায় কাউন্টার-সত্যায়ন করাতে হবে।

  • সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন: চূড়ান্ত কার্যকারিতার জন্য বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক।

জরুরি সতর্কতা

সম্পত্তি রক্ষার তাগিদে প্রবাসীরা যাকে ‘অ্যাটর্নি’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ করছেন, সেই ব্যক্তিটি কতটা বিশ্বস্ত তা শতবার ভাবা উচিত। অন্ধভাবে কাউকে সম্পূর্ণ ক্ষমতা বা ‘জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ না দিয়ে, নির্দিষ্ট কাজের জন্য ‘স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।

ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে এখন অনলাইনের মাধ্যমেই অনেক কিছু যাচাই করা সম্ভব। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত এই সম্পদ রক্ষায় আইনি অসচেতনতা যেন কাল না হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক নিয়ম মেনে আমমোক্তারনামা সম্পাদন করলে একদিকে যেমন আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে দূর প্রবাসেও থাকা যায় সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তামুক্ত।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *