প্রবাস ফেরতদের পুনর্বাসনে গতি আনছে সরকারি-বেসরকারি মেলবন্ধন

বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ শ্রম শেষে শূন্য হাতে বা নানা প্রতিকূলতায় দেশে ফিরে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের টেকসই পুনর্বাসনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহ। যৌথ উদ্যোগে প্রবাস ফেরতদের আর্থিক প্রণোদনা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ দিয়ে মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
যে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি, বিদেশের মাটিতে কাজ হারিয়ে কিংবা নানা সংকটে তাদের হঠাৎ দেশে ফিরে আসা এক ভিন্ন ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। পরিবার ও সমাজে তারা রাতারাতি এক মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হন। বিদেশের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে কীভাবে নতুন করে জীবিকা শুরু করবেন, তা নিয়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা।
এই বাস্তবতায়, ফিরে আসা কর্মীদের শুধু ‘রেমিট্যান্সদাতা’ হিসেবে না দেখে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে দেশের মাটিতে কাজে লাগানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাস ফেরত এই বিপুল জনশক্তিকে সঠিক পুনর্বাসনের আওতায় আনা না গেলে দেশে বেকারত্বের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি ‘রেইস’ প্রকল্প ও নতুন আশার আলো
প্রবাস ফেরতদের এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চালু করেছে ‘রেইস’ (RAISE – Recovery and Advancement of Informal Sector Employment) প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২ লাখের বেশি ফেরত আসা প্রবাসীকে চিহ্নিত করে এককালীন আর্থিক সহায়তা, ব্যবসায়িক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় ‘ইনক্লুসিভ ওয়েলফেয়ার সেন্টার’ বা ইডব্লিউসি (EWC) স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রবাসীরা মানসিক কাউন্সিলিং, আর্থিক সাক্ষরতা এবং সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য রেফারেল সেবা পাচ্ছেন।
প্রবাস ফেরতদের পুনর্বাসনে চলমান প্রধান সেবাসমূহ:
আর্থিক অনুদান ও ক্যাশ ইনসেনটিভ: ‘রেইস’ প্রকল্পের আওতায় যোগ্য ফেরত আসা কর্মীদের এককালীন ১৩,৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ: সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন এবং ব্যবসার পরিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ ঋণ সুবিধা।
বেসরকারি উদ্যোগ (ব্র্যাক ও আরএমএমআরইউ): ব্র্যাকের ‘রিইন্টিগ্রেশন প্রজেক্ট’ এবং রামরু (RMMRU)-এর মতো বেসরকারি সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে কৃষি, ডেইরি ফার্মিং ও এসএমই খাতের জন্য সরাসরি গবাদিপশু, যন্ত্রপাতি ও ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
পূর্ব অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি (RPL): প্রবাসে অর্জিত কারিগরি দক্ষতাকে যাচাই করে সরকারি সনদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা দেশের বাজারে ভালো বেতনে চাকরি পেতে সাহায্য করে।
বড় চ্যালেঞ্জ: সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের অভাব
উদ্যোগ অনেক থাকলেও প্রান্তিক পর্যায়ের প্রবাসীদের কাছে এখনো সব তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। অনেক কর্মী জানেনই না যে দেশে ফেরার পর তাদের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। আবার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিল নথিপত্রের বাধ্যবাধকতা অনেক সাধারণ কর্মীকে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলোর মধ্যে কাজের তদারকি ও সমন্বয় আরও বাড়ানো দরকার।
প্রবাস থেকে ফিরে আসা কর্মীরা দেশের জন্য কোনো বোঝা নন, বরং তারা এক একটি দক্ষ মানবসম্পদ। বিদেশের মাটিতে আধুনিক প্রযুক্তি বা ব্যবস্থাপনায় তারা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা দেশীয় শিল্পে রূপান্তর করার উপযুক্ত সময় এখনই। সরকারি উদ্যোগের সাথে বেসরকারি খাতের এই অংশীদারিত্ব যদি প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবেই টেকসই হবে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি। প্রবাস ফেরতদের যথাযথ সম্মান ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই হোক ২০২৬ সালের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য।











