নভেম্বর ৯, ২০২৬
#আইনি সহায়তা #নারী প্রবাসী #শীর্ষ-৩

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের ঢাল কতটুকু কার্যকর?

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের ঢাল কতটুকু কার্যকর?

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন হাজারো নারী। আন্তর্জাতিক কনভেনশন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ায় কমছে না তাদের দীর্ঘশ্বাস।

পর্দার আড়ালের অন্ধকার বাস্তবতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে সেসব প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের হাত ধরে, যারা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব, জর্ডান, ওমান বা লেবাননে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই নারীদের একটি বিশাল অংশ বিদেশের মাটিতে গিয়ে এমন এক দাসত্বে বন্দি হয়ে পড়েন, যেখানে তাদের মৌলিক মানবাধিকারটুকুও পদদলিত হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নিয়োগকর্তার বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই কেড়ে নেওয়া হয় তাদের মোবাইল ফোন এবং পাসপোর্ট। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই কাজ করানো, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া এবং বেতন আটকে রাখা সেখানে এক নিত্যদিনের চিত্র। ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই নির্যাতনগুলো অনেক সময় জনসমক্ষে আসেই না, যতক্ষণ না কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

বিশ্বজুড়ে প্রবাসী ও গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কনভেনশন বা চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইএলও কনভেনশন ১৮৯ (ILO Convention 189), যা বিশেষভাবে গৃহশ্রমিকদের শোভন কর্মপরিবেশ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি এবং ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার কথা বলে। এছাড়া জাতিসংঘের ‘সিডও’ (CEDAW) সনদ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের অঙ্গীকার করে।

কিন্তু বড় সমস্যাটি হলো, যেসব দেশে আমাদের নারী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন, সেই দেশগুলোর অনেকেই এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোতে অনুস্বাক্ষর করেনি। ফলে স্থানীয় আইনের মারপ্যাঁচে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিগুলো সেখানে প্রায়শই মুখ থুবড়ে পড়ে।

নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রধান আইনি হাতিয়ার ও চ্যালেঞ্জসমূহ:

  • আইএলও কনভেনশন ১৮৯: গৃহশ্রমিকদের সাধারণ শ্রমিকের মর্যাদা দেয়, যা এখনো অনেক মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আইনি স্বীকৃতি দেয়নি।

  • কাফালা প্রথা বনাম আন্তর্জাতিক আইন: মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত ‘কাফালা’ বা স্পন্সরশিপ প্রথার কারণে শ্রমিকরা নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি পরিবর্তন বা দেশত্যাগ করতে পারেন না, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

  • দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (MoU): বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি করলেও সেখানে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট।

  • আইনি সহায়তার অভাব: নির্যাতনের শিকার নারীরা ভাষা ও যাতায়াত সমস্যার কারণে স্থানীয় শ্রম আদালত বা দূতাবাসে পৌঁছাতে পারেন না।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও দ্বিপাক্ষিক জবাবদিহিতা

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক আইনের দিকে তাকিয়ে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক শক্তি বাড়িয়ে গন্তব্য দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করতে হবে। বিশেষ করে, যেকোনো নির্যাতনের ঘটনায় যেন স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়, সেই আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। একই সাথে, দূতাবাসগুলোর সেবার মান বাড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা সচল হেল্পলাইন এবং দক্ষ আইনি প্যানেল গঠন করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ সমীকরণ

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের পাঠানো প্রতিটি টাকা দেশের মাটিকে সমৃদ্ধ করছে, কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের একটি বড় ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক আইন কেবল কাগজে-কলমে বন্দি না রেখে, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

গন্তব্য দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য বহুপাক্ষিক চাপ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর নীতি পুনর্বিবেচনা করার এখনই উপযুক্ত সময়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *