প্রবাস জীবনের ইতি: কষ্টার্জিত পুঁজিতে দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের সেরা সুযোগ কোথায়?

দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে অনেক প্রবাসীই এখন স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসছেন। অবসর জীবনের এই সময়ে তাঁদের উপার্জিত জমানো মূলধনকে সুরক্ষিত রাখতে এবং একটি নিয়মিত আয়ের উৎস তৈরি করতে দেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগের খাত উন্মোচিত হয়েছে, যা প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যাঁরা জীবনের সোনালী সময় বিদেশের মাটিতে পার করে দিয়েছেন, অবসরের পর দেশে ফেরা তাঁদের জন্য একাধারে আনন্দের, আবার অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জীবিকার এক বড় চ্যালেঞ্জ। সারাজীবনের সঞ্চয়টুকু ভুল খাতে বা কোনো অনিরাপদ ব্যবসায় খাটিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা আমাদের সমাজে কম নয়। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় কোনো ব্যবসায় হাত দেওয়ার আগে প্রবাসীদের অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্বাচন করতে হবে।
সাংবাদিক হিসেবে গত দেড় দশকে অসংখ্য রেমিট্যান্স যোদ্ধার দেশে ফেরার গল্প কাভার করেছি। তাঁদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা বলে, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়া কোনো একক বা নতুন ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর চেয়ে বরং সরকারের দেওয়া বিভিন্ন বন্ড এবং আধুনিক রূপান্তরশীল খাতগুলোতে অর্থ খাটানো অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সরকারি সঞ্চয়পত্র ও বন্ড: শতভাগ নিরাপদ বিনিয়োগের প্রথম পছন্দ
অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ বন্ড ও সঞ্চয়পত্র। বিশেষ করে ‘ওয়েজ আর্নার কর্পোরেট বন্ড’, ‘ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড’ এবং ‘ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড’ প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এসব খাতে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন আকর্ষণীয় মুনাফা পাওয়া যায়, অন্যদিকে মূলধনের শতভাগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা থাকে।
এছাড়া, দেশের দ্রুত বর্ধনশীল আবাসন খাত (রিয়েল এস্টেট) প্রবাসীদের জন্য আরেকটি চমৎকার ক্ষেত্র। রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে বাণিজ্যিক স্পেস কিংবা ফ্ল্যাট কিনে রাখলে তা থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অংকের ভাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অবশ্যই নথিপত্রের সত্যতা ও আইনি বৈধতা খুব ভালো করে যাচাই করে নিতে হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশের এই যুগে কৃষিশিল্প বা অ্যাগ্রো-বিজনেস (যেমন আধুনিক ডেইরি ফার্ম, মৎস্য চাষ বা হাইড্রোপ্রনিক্স) এবং শেয়ার বাজারের ‘মিউচুয়াল ফান্ড’ও প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য দারুণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগের সেরা ৪টি খাত:
ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ও সঞ্চয়পত্র: সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত এবং উচ্চ মুনাফা সম্পন্ন সরকারি বিনিয়োগ মাধ্যম, যা প্রবাসীদের নিয়মিত আয়ের পথ নিশ্চিত করে।
আবাসন বা রিয়েল এস্টেট: ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি ক্রয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক ভাড়ার উৎস হিসেবে কাজ করে।
আধুনিক কৃষিশিল্প ও ডেইরি: দেশের মাটিতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ বা একক কৃষি প্রকল্প, যার বর্তমান বাজার চাহিদা অত্যন্ত ব্যাপক।
ট্রেজারি বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ড: সরাসরি শেয়ার বাজারের ঝুঁকি এড়াতে পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ড বা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
একটি সুরক্ষিত আগামীর প্রত্যাশা
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছে, তাঁদের অবসর জীবনকে রাঙানো এবং সুরক্ষিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও। দেশে ফিরে প্রবাসীরা যেন ওয়ান-স্টপ সেবার মাধ্যমে সব ধরনের বিনিয়োগের তথ্য ও আইনি পরামর্শ পান, তার জন্য একটি বিশেষ উইং থাকা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, অবসর জীবনের বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি স্থায়ী ক্যাশ-ফ্লো বা নিয়মিত আয় তৈরি করা। সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক খাতে মূলধন নিয়োজন এবং সাময়িক লোভের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে পারলে প্রবাসীদের পরবর্তী জীবন নিজ মাতৃভূমিতে কাটবে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সাথে।










