উইকেন্ড বাংলা স্কুল: প্রবাসে শিকড় আঁকড়ে থাকার নীরব বিপ্লব

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্যস্ত শহরগুলোতে উইকেন্ড বাংলা স্কুল এখন প্রবাসী বাঙালি পরিবারের জন্য শেকড়ের সঙ্গে সংযোগের এক অনন্য ঠিকানা হয়ে উঠেছে। ভিনদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের শিশুদের মুখের বুলি যখন ইংরেজি কিংবা ফরাসি, তখন ছুটির দিনের এই পাঠশালাগুলো তাদের শেখাচ্ছে বর্ণমালা ও রক্তে ভেজা একুশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। শেকড় হারিয়ে ফেলার ভয় থেকেই মূলত এই স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে।
লন্ডনের ইস্ট এন্ড, নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস কিংবা টরন্টোর ড্যানফোর্থ—শনিবার ও রবিবারের সকালগুলোতে এই এলাকাগুলোর ছবিটা অনেকটাই আলাদা। সপ্তাহের সাধারণ দিনগুলোতে ব্রিটিশ বা আমেরিকান স্কুলে ব্যস্ত থাকা শিশুরা ছুটির সকালে খাতা-পেন্সিল নিয়ে হাজির হয় কোনো চার্চের ভাড়া করা হল কিংবা পাবলিক লাইব্রেরির কক্ষে।
বাইরে কনকনে ঠান্ডা কিংবা ঝকঝকে রোদের মধ্যেও ভেতরের পরিবেশটি পুরোপুরি এক টুকরো বাংলাদেশ। দেয়ালে টানানো বাংলা বর্ণমালার চার্ট, শিশুদের আঁকা শহীদ মিনার আর ব্ল্যাকবোর্ডে যত্ন করে লেখা ‘অ, আ, ক, খ’। সহপাঠীদের সাথে অনর্গল ইংরেজিতে আড্ডা দিতে থাকা কিশোর-কিশোরীরা ক্লাসরুমে ঢোকার পর জড়তা ভেঙে শিক্ষককে বলছে ‘শুভ সকাল’। এই ছোট্ট পরিবর্তনটুকুই দীর্ঘ প্রবাসে অভিভাবকদের পরম পাওয়া।
বিদেশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের শিশুদের সাথে ঘরের প্রবীণদের ভাষাগত দূরত্ব দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। দেশে থাকা দাদা-দাদি বা নানা-নানির সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই শব্দ হারিয়ে ফেলে অনেক কিশোর। ইংরেজি ভাষায় তাদের পড়াশোনা ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ যতটা সাবলীল, নিজের মায়ের ভাষায় তারা ঠিক ততটাই আড়ষ্ট।
এই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতেই অভিভাবকরা সন্তানকে উইকেন্ড বাংলা স্কুলগুলোতে নিয়ে আসছেন। কেবল অক্ষর চেনানো নয়, শিশুদের কানে মিষ্টি বাংলা শব্দের সুর তুলে দেওয়াই এখানে মূল উদ্দেশ্য। প্রথম দিকে অনেকেই হয়তো অনিচ্ছা নিয়ে আসে, কিন্তু গল্প, ছড়া আর গানের ক্লাসের মধ্য দিয়ে তাদের ভেতর বাংলা জানার আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়। এতে ঘরের ভেতরেও বাংলায় কথা বলার পরিবেশ প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
প্রবাসে ভাষা শেখানোর লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গতানুগতিক পাঠ্যক্রমের অপ্রতুলতা। বাংলাদেশের প্রচলিত পাঠ্যবইগুলো বিলেত কিংবা আমেরিকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের বাস্তবতার সাথে অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। যে শিশুটি ইংরেজিতে চিন্তা করে, তাকে ‘অ’-তে ‘অজগর’ বোঝানোর চেয়ে পরিচিত জীবনের অনুষঙ্গ দিয়ে শেখানো অনেক বেশি কার্যকর।
শিক্ষকরা তাই পাঠ্যবইয়ের বাইরে এসে আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছেন। ডিজিটাল ফ্ল্যাশকার্ড, অ্যানিমেশন, রঙিন ড্রয়িং আর নাটকের মধ্য দিয়ে অক্ষর জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে সহজ ভাষায় শুনিয়ে দেওয়া হচ্ছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা। শেখার প্রক্রিয়াটি আনন্দদায়ক হওয়ায় শিশুরা পড়াটিকে বাড়তি চাপ হিসেবে দেখছে না।
সীমাহীন আন্তরিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক টানাপোড়েন উইকেন্ড বাংলা স্কুলগুলোর সার্বিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ স্কুলেরই নিজস্ব কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। প্রতি সপ্তাহান্তে স্থানীয় স্কুলের মিলনায়তন কিংবা কমিউনিটি সেন্টারের কক্ষ চড়া ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করতে হয় ক্লাস।
শিক্ষক হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তাদের সিংহভাগই বিনা পারিশ্রমিকে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকেন। অভিভাবকদের দেওয়া সামান্য অনুদান দিয়ে বাড়িভাড়া ও খাতা-কলমের খরচ মেটাতেই হিমশিম খান উদ্যোক্তারা। প্রবাসের বুকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই আত্মপরিচয়ের মশাল পৌঁছে দিতে স্থানীয় দূতাবাস ও সচ্ছল প্রবাসী ব্যবসায়ীদের প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান এখন সময়ের দাবি।











