নভেম্বর ৯, ২০২৬
#দুর্ঘটনা #মধ্যপ্রাচ্য

মরুভূমির তপ্ত বালু ছেড়ে কফিনবন্দী তারেক হালিশহরে: অশ্রুভেজা বিদায়

বাসার উঠানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ ছাপিয়ে চারপাশ থেকে ভেসে আসছে গুমরে কাঁদা আর বিলাপের সুর। ভেতরের হিমশীতল কফিনে সাদা কাফনে মোড়ানো এক নিথর দেহ। দূরদেশ থেকে আসা প্রিয় মানুষটির জন্য স্বজনদের প্রতীক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের, কিন্তু সেই ফেরা যে এত স্তব্ধ আর ভারী হবে, তা হয়তো কল্পনাও করেনি কেউ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের লেলিহান শিখায় বাহরাইনে প্রাণ হারানো এস এম তারেকের শেষ বিদায়ের চিত্র ছিল এমনই হৃদয়বিদারক।

শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ঈদগাহ বউবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসায় যখন তারেকের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি এসে পৌঁছায়, তখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আহাজারিতে। গত ১ মার্চ রাতে বাহরাইনে এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা এস এম তারেক। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে সড়কপথে মরদেহটি চট্টগ্রামে আনা হয়।

জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতির আগে ক্ষণিকের জন্য কাফন সরানো হয়েছিল। একমাত্র মেয়ে এবং স্ত্রীসহ নিকটাত্মীয়রা শেষবারের মতো তারেকের মুখ দেখার সুযোগ পান। প্রিয়তম মানুষের ঠান্ডা কপালে হাত রেখে স্ত্রীর সেই নির্বাক চেয়ে থাকা কিংবা বাবার লাশের পাশে অবুঝ মেয়ের দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য উপস্থিত কারোরই চোখের কোণ শুকনো রাখতে দেয়নি। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে নিজেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পরিণত হওয়া এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার এই প্রস্থান যেন পুরো জনপদকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!

তারেকের আদি নিবাস চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে হলেও জীবিকার তাগিদে সপরিবারে হালিশহরে ভাড়া থাকতেন। পরিবারকে একটু সচ্ছলতা দিতে এবং মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন বাহরাইনে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর চলমান যুদ্ধের বলি হতে হলো এই নিরীহ প্রবাসীকে। ১ মার্চের সেই অভিশপ্ত রাতে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে যায় তারেকের সাজানো সংসার আর রঙিন সব পরিকল্পনা।

বিদেশের মাটিতে কাজ শেষে যখন ঘরে ফেরার কথা ছিল, তখন কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন তিনি। তারেকের এই অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশির নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও বড় করে সামনে নিয়ে এসেছে।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তারেকের স্ত্রী। যেখানে স্বামী বিদেশ থেকে টাকা পাঠাবেন এবং সেই টাকায় মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের চাকা ঘুরবে—সেই স্বপ্ন এখন ধোঁয়াশায় ঢাকা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের বীমা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও, তা কি পারবে একটি বাবার অভাব পূরণ করতে? স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন, যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে প্রবাসীদের নিরাপত্তার বিষয়টি যেন আন্তর্জাতিকভাবে উত্থাপন করা হয়।

তারেকের মতো যারা মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুতে ঘাম আর রক্ত ঝরান, তাদের জীবনের মূল্য কি কেবল একটি সংবাদপত্রের শিরোনামেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে হালিশহরের গলিতে গলিতে।

মরুভূমির তপ্ত বালু ছেড়ে কফিনবন্দী তারেক হালিশহরে: অশ্রুভেজা বিদায়

তিন দেশ থেকে ফিরল ৩৪ প্রবাসীর মরদেহ,

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *