প্রকৌশলবিদ্যার ‘এভারেস্ট’ ফ্রান্সের সেন্ট্রাল সুপেলেক

ফ্রান্সের গিফ-সুর-ইভেট উপত্যকায় অবস্থিত ‘সেন্ট্রাল সুপেলেক’ কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বাতিঘর। ২০১৫ সালে দুই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান ‘ইকোল সেন্ট্রাল প্যারিস’ এবং ‘সুপেলেক’-এর একীভূতকরণের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই বিদ্যাপীঠটি বর্তমানে বৈশ্বিক প্রযুক্তির মানচিত্রে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যারা আগামীর পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের কাছে এই নাম আজ আভিজাত্য আর মেধার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
সেন্ট্রাল সুপেলেকের শেকড় অনেক গভীরে। ১৮২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইকোল সেন্ট্রাল এবং ১৮৯৪ সালের সুপেলেক—উভয়ই ফ্রান্সের শিল্প বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। গুস্তাভ আইফেল, যিনি প্যারিসের আইফেল টাওয়ার তৈরি করেছিলেন, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানেরই সন্তান। বর্তমানে এটি ‘প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়’-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।
এখানকার শিক্ষা পদ্ধতি মূলত ‘গ্রঁদ একোল’ মডেলের অনুসারী। এর অর্থ হলো, এখানে ভর্তির সুযোগ পেতে একজন শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। এই কঠোর বাছাই প্রক্রিয়াই নিশ্চিত করে যে, এখানকার প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল মেধাবীই নন, বরং তারা যেকোনো জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম।
সেন্ট্রাল সুপেলেকের বিশেষত্ব হলো এর পাঠ্যক্রম, যা তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক প্রয়োগের চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করে। এখানকার ল্যাবরেটরিগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে এমন সব গবেষণা চলছে, যা সরাসরি ইউরোপের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
বিশ্বের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী যেমন—এয়ারবাস, টোটালএনার্জিস এবং দ্যাসো সিস্টেমস-এর সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবিড় অংশীদারিত্ব রয়েছে। ফলে এখানকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই বাস্তব পেশাদার জগতের স্বাদ পান। কেবল প্রকৌশলী নয়, বরং ‘ইঞ্জিনিয়ার-লিডার’ তৈরি করাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। এখানকার অনেক গ্র্যাজুয়েট বর্তমানে বিশ্বের নামী কোম্পানিগুলোর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একনজরে সেন্ট্রাল সুপেলেক (CentraleSupélec):
প্রতিষ্ঠা: ২০১৫ (ইকোল সেন্ট্রাল ও সুপেলেকের একীভূত রূপ)।
অবস্থান: প্রধান ক্যাম্পাস পালাইজো (প্যারিস-স্যাকলে ক্লাস্টার), ফ্রান্স।
র্যাঙ্কিং: প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে ফ্রান্সের শীর্ষ দুটি প্রতিষ্ঠানের একটি এবং বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম সারিতে।
অ্যালুমনাই: গুস্তাভ আইফেল থেকে শুরু করে বর্তমানের বহু প্রভাবশালী করপোরেট লিডার।
গবেষণা: ১৭টি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি যা বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা সংস্থাগুলোর সাথে যুক্ত।
আন্তর্জাতিকীকরণ: বিশ্বের ৩০০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষার্থী বিনিময় ও যৌথ গবেষণা চুক্তি।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি খাতের জন্য সেন্ট্রাল সুপেলেক হতে পারে এক আদর্শ অনুপ্রেরণা। আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যারা মূলত উচ্চতর রোবোটিক্স বা জ্বালানি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য ফ্রান্সের এই প্রতিষ্ঠানটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
সাধারণত উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর তুলনায় ফ্রান্সে পড়ার খরচ অনেক কম, কারণ এখানে পাবলিক সেক্টরে বিশাল সরকারি ভর্তুকি থাকে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এখন প্রচুর ইংরেজি মাধ্যম প্রোগ্রাম চালু হওয়ায় ভাষার বাধা অনেক কমেছে। এছাড়া আইফেল স্কলারশিপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আর্থিক সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের এই ল্যাবে গবেষণার সুযোগ পেতে পারেন।











