সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাজের নতুন বিধি

ইউরোপীয় দ্বীপদেশ সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন কাজের আইনি সুরক্ষায় নতুন বিধিমালা জারি করেছে দেশটির সরকার। নতুন এই নির্দেশনায় নন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের) শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাতে সাপ্তাহিক কাজের সর্বোচ্চ সময়সীমা এবং ন্যূনতম পারিশ্রমিকের পরিমাণ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে কৃষি, গ্যাস স্টেশন, ফুড ডেলিভারি ও রেস্তোরাঁ খাতে কর্মরত শিক্ষার্থীরা একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আসছেন। দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসী ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ ছিল, কাজের নির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে নিকোসিয়া কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখন থেকে নিয়োগকর্তারা শিক্ষার্থীদের ইচ্ছামতো অতিরিক্ত সময় খাটাতে পারবেন না কিংবা কম পারিশ্রমিক দিয়ে ঠকাতে পারবেন না। নিয়ম অমান্য করলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রাখা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নন-ইইউ শিক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। ইইউ ভুক্ত দেশের নাগরিকদের তুলনায় এই শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ ও অধিকার সাধারণত বেশ সীমিত থাকে। সাইপ্রাসে মূলত সেবাখাতেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। গ্যাস স্টেশন, রেস্তোরাঁ এবং ফুড ডেলিভারির মতো শ্রমঘন কাজে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আইনি সুরক্ষা না থাকায় এতদিন এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। নতুন নিয়মের কারণে এই খাতগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং স্থানীয় নিয়োগকর্তারাও একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে কর্মী নিয়োগ করতে বাধ্য হবেন।
উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে ভূমধ্যসাগরীয় এই দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা সহনশীল হলেও, টিউশন ফি এবং দৈনন্দিন খরচ জোগাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মূলত খণ্ডকালীন কাজের ওপরই নির্ভর করতে হয়। নতুন নিয়মে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত খাতগুলোর বাইরে শিক্ষার্থীরা চাইলেই যেকোনো পেশায় যুক্ত হতে পারবেন না। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার বেশি কাজ করানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আইনি এই সুরক্ষার ফলে শিক্ষার্থীরা এখন থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে নিজেদের খরচ উপার্জনের একটি নিরাপদ ও শোষনমুক্ত পরিবেশ পাবেন। আগে যেখানে কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না, সেখানে নতুন নিয়ম শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
সাইপ্রাসের বিভিন্ন স্বনামধন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। খণ্ডকালীন কাজের নতুন এই বিধিমালার কারণে সরাসরি লাভবান হবেন তারা। অতীতে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ফুড ডেলিভারি বা রেস্তোরাঁয় কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত শ্রম দিতে বাধ্য হতেন। বাড়তি কাজের চাপে তাদের মূল পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। মজুরি বঞ্চনার শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে চরম অর্থনৈতিক টানাপোড়েনেও ভুগতে দেখা গেছে। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ও সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশি তরুণরা এখন থেকে তাদের দেওয়া শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পাবেন। বাড়তি কাজের চাপ না থাকায় তারা নিজেদের ক্লাসে ও গবেষণায় আরও বেশি সময় দিতে সক্ষম হবেন।
পড়াশোনার গুণগত মান বজায় রাখা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থেই সাইপ্রাস সরকার এমন যুগোপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদরা। কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের আইনি অধিকার নিশ্চিত হওয়া যেকোনো বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্যই একটি বড় স্বস্তির খবর। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আইনি এই সুরক্ষার ফলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সাইপ্রাসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।











