অর্থনীতির প্রাণভোমরা মধ্যপ্রাচ্য: রেমিট্যান্সের অর্ধেকই আসছে জিসিসি থেকে

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের ঘামঝরানো আয়ের কোনো বিকল্প নেই। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের সিংহভাগেরই গন্তব্য ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো, যা জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৯ জন কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বিশাল জনশক্তির প্রায় ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ বা ৯ লাখ ১৯ হাজার ৯৮১ জনই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলোতে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—এই ছয়টি দেশই এখন বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান চারণভূমি।
ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাজার সম্প্রসারণের কথা বারবার বলা হলেও, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় শ্রেণির শ্রমিকের জন্যই মধ্যপ্রাচ্য এখনো সবচেয়ে সহজলভ্য ও বড় গন্তব্য। বিশ্লেষকদের মতে, নির্মাণ খাত, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং সেবা খাতে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশই পূরণ করছে বাংলাদেশ।
কেবল মানুষ যাওয়াই নয়, টাকা আসার ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রধান ভরসা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্যমতে, গত ২০২৫ সালে প্রবাসীরা মোট ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন (৩ হাজার ২৮০ কোটি) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই বিশাল অংকের প্রায় ৪৬ শতাংশ বা ১৫ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলারই এসেছে জিসিসি দেশগুলো থেকে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসছে এই নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে।
আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!
এটি স্পষ্ট যে, কাজ এবং আয়ের জন্য বাংলাদেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা যেমন আমাদের অর্থনীতির শক্তি, তেমনি এর মধ্যে কিছুটা ঝুঁকিও লুকিয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা তেলের বাজারে দরপতন ঘটলে সরাসরি তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পকেটে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, একক কোনো অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশই সাধারণ শ্রমিক। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে এবং উন্নত বিশ্বের (যেমন- ইউরোপ, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া) শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে পারলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। তবে বর্তমান বাস্তবতায় জিসিসি দেশগুলোই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে নির্মাণ ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ কর্মী খুঁজছে। তাই যারা যাচ্ছেন, তাদের ভাষাগত ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠাতে পারলে মাথাপিছু আয়ের চিত্র আরও উজ্জ্বল হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কেবল একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নয়, এটি আমাদের জাতীয় অগ্রগতির চাবিকাঠি। ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় এই অঞ্চল থেকে আসা মানে হলো লক্ষ লক্ষ পরিবারের অন্ন-বস্ত্র আর সন্তানদের সুশিক্ষার নিশ্চয়তা। তবে সরকারের উচিত মধ্যপ্রাচ্যের এই সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমবাজারকে আরও বহুমুখী করা। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই অবদানকে টেকসই করতে হলে তাদের আইনি সুরক্ষা ও বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।











