আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল আতঙ্কে লাখো শ্রমিক

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল হওয়ার আকস্মিক ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারে চরম অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির নজরদারিতে প্রায় ৫ হাজার প্রবাসীর কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল আঞ্চলিক সংঘাতের ভিডিও অনুমতি ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর অভিযোগে নেওয়া হচ্ছে এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সাইবার নিরাপত্তা নীতি কার্যকর করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির দৃশ্য কিংবা অনির্ধারিত রাজনৈতিক প্রচারণার ভিডিও স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করে আপলোডকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করছে এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। কোনো ধরনের পুলিশি তলব বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় ইমিগ্রেশন সার্ভার থেকে রেসিডেন্ট পারমিট বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই বুঝতে পারেননি সামান্য একটি ভিডিও শেয়ার তাদের জীবিকার ওপর এমন বিপর্যয় ডেকে আনবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কঠোর সাইবার অপরাধ আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় নির্মাণ শ্রমিক ও সাধারণ পেশাজীবীরা না বুঝেই এই ভুল করে ফেলেছেন। মুঠোফোনে আসা একটি বার্তা কিংবা কোম্পানির কফিলের কাছ থেকে হঠাৎ করে নিজেদের ভিসা বাতিলের খবর পেয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে তাঁদের।
হঠাৎ করে আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল হওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন ছুটিতে বাংলাদেশে আসা প্রবাসীরা। স্বজনদের সঙ্গে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর অনেকেই জানতে পারছেন তাদের প্রবেশানুমতি নেই। বছরের পর বছর রক্ত পানি করে গড়ে তোলা ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও সঞ্চিত সম্পদ এক নিমেষেই হাতছাড়া হওয়ার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে যারা বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাঁদের গ্রাস করেছে গ্রেফতার ও জরিমানার আতঙ্ক। ভিসা বাতিলের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবস্থান বৈধ করতে না পারলে বা দেশ না ছাড়লে গুনতে হয় চড়া অংকের জরিমানা। দেশটিতে সাধারণ কর্মীদের নতুন ভিসা প্রাপ্তি এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে সীমিত। তার ওপর এ ধরনের ব্যাপক পদক্ষেপে প্রায় বারো লাখ বাংলাদেশির সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারটিতে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
উদ্ভূত সংকটে আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস ও দুবাই কনস্যুলেটের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী ও প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় দুবাই কনস্যুলেটে অবিলম্বে একটি লিগ্যাল এইড সেল চালু করা প্রয়োজন। এই সেল থেকে শ্রমিকরা জানতে পারবেন তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী অভিযোগ উঠেছে এবং তা নিরসনের কোনো আইনি উপায় অবশিষ্ট আছে কি না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—বরং এটি স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত জটিল প্রক্রিয়া। তাই আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল সংকটের সমাধান পেতে হলে প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করতে হবে। সরকারিভাবে দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে সাধারণ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবিকা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।











