নভেম্বর ৯, ২০২৬
#মধ্যপ্রাচ্য #সংযুক্ত আরব আমিরাত #সৌদি আরব

বিশ্বম্যাপে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা: শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বড় রদবদল

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল জীবনীশক্তি বা ‘লাইফলাইন’ হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সাম্প্রতিক বিশ্ব ভূ-রাজনীতি এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের ফলে রেমিট্যান্স আহরণের চিরাচরিত তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের একক আধিপত্য ছাপিয়ে এখন ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আশাবজক হারে বাড়ছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হিসেবে সৌদি আরব অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও বর্তমানে সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। যদিও এখনো দেশটি শীর্ষস্থানে রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা অর্থের অংক গত কয়েক মাসে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে দক্ষ জনবল রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও প্রণোদনা এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছে।

শ্রমবাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মালয়েশিয়া ও ওমানের মতো দেশগুলোতে ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতার কারণে সেখান থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর।

অন্যদিকে, ইতালি ও ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেখানে মজুরি কাঠামো উন্নত হওয়ায় রেমিট্যান্সের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে যারা পেশাদার বা কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কাজ নিয়ে ইউরোপে গিয়েছেন, তাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব দিচ্ছে।

তবে কেবল দেশ নয়, মুদ্রার বিনিময় হার বা ডলারের দামের ওঠানামাও এই তালিকায় প্রভাব ফেলছে। কুয়েত ও কাতার থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ স্থিতিশীল থাকলেও, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদীয়মান বাজারগুলো এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ই-৯ ভিসার আওতায় দক্ষ শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরিয়া থেকে আসা রেমিট্যান্সের গুণগত মান ও পরিমাণ দুই-ই বাড়ছে।

রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ ১০টি দেশের বর্তমান তালিকা ও প্রেক্ষাপট:

  • ১. সৌদি আরব: এখনো শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও নির্মাণ খাতের মন্দার কারণে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে।

  • ২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: গত দুই বছরে অভাবনীয় সাফল্য। বিশেষ করে দক্ষ পেশাজীবী ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরে বড় অংকের ডলার আসছে।

  • ৩. সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই): গোল্ডেন ভিসা এবং ব্যবসায়িক নমনীয়তার কারণে দুবাই ও আবুধাবি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ তুঙ্গে।

  • ৪. যুক্তরাজ্য (ইউকে): পাউন্ডের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন অভিবাসন নীতি বাংলাদেশিদের জন্য অনুকূল ভূমিকা পালন করছে।

  • ৫. কুয়েত: দিনারের শক্তিশালী মান এবং পুরনো কর্মীদের স্থিতিশীল আয়ের কারণে দেশটি এখনো শীর্ষ পাঁচে।

  • ৬. মালয়েশিয়া: শ্রমবাজার নিয়ে নানা টানাপোড়েন থাকলেও বাংলাদেশি কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে রেমিট্যান্স আসছে নিয়মিত।

  • ৭. কাতার: বিশ্বকাপ পরবর্তী সময়ে নির্মাণ কাজ কমলেও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীরা ভালো করছেন।

  • ৮. ইতালি: ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে ইতালির উত্থান এখন দৃশ্যমান।

  • ৯. ওমান: সাধারণ কর্মীদের আধিক্য থাকলেও সম্প্রতি ভিসা কড়াকড়িতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা স্তিমিত।

  • ১০. দক্ষিণ কোরিয়া: প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের দক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আহরণে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে দেশটি।

কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে রেমিট্যান্সের উৎস বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত বিজয়। তবে এই ধারা বজায় রাখতে হলে সরকারকে ‘দক্ষ জনশক্তি’ রপ্তানিতে আরও বিনিয়োগ করতে হবে।

অদক্ষ শ্রমিকরা যে পরিমাণ অর্থ পাঠান, একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান বা আইটি বিশেষজ্ঞ তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ পাঠাতে সক্ষম।

ভবিষ্যতে যদি জাপান বা জার্মানির মতো বাজারগুলো পুরোপুরি ধরা যায়, তবে শীর্ষ ১০-এর এই তালিকায় বড় ধরণের ওলটপালট হতে পারে। একই সাথে হুন্ডি প্রতিরোধে বিদেশের মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

বিশ্বম্যাপে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা: শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বড় রদবদল

অল্প আয়েও গড়ুন স্বপ্নের পাহাড়: প্রবাসীদের জন্য

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *