মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি স্কুলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার সংকট ও সম্ভাবনা

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির সন্তানদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা ‘বাংলাদেশ কারিকুলাম’ স্কুলগুলো এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নিজস্ব ভবনের অভাব, অর্থায়ন জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কঠোর আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে ব্যাহত হচ্ছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন।
প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ হয়ে টিকে থাকা এই বিদ্যাপীঠগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলোতে বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত প্রবাসীদের সন্তানদের বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠদান করে থাকে, যাতে তারা বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, অধিকাংশ স্কুলই বছরের পর বছর ধরে ভাড়া করা ভবনে ধুঁকে ধুঁকে চলছে, যেখানে নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ বা আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা।
সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য ও অভিভাবকদের ভাষ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বর্তমানে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনছে। অনেক দেশে স্থানীয় সরকার স্কুলগুলোর জন্য নিজস্ব বিশাল ভবন ও আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক করেছে।
বাংলাদেশি স্কুলগুলো এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায়শই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বিশেষ করে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দায় অবস্থিত স্কুলগুলো বারবার স্থানান্তরের চাপে পড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বড় ধরণের ব্যাঘাত ঘটছে।
আর্থিক সংকট এই স্কুলগুলোর আরেকটি প্রধান ক্ষত। প্রবাসীদের ব্যক্তিগত অনুদান ও শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর নির্ভর করে চলা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বকেয়া থাকছে। ফলে মেধাবী শিক্ষকরা পেশা ছেড়ে অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
এছাড়া, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষাগুলোর (জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি) ফলাফল সময়মতো প্রকাশ এবং সনদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও প্রবাসের এই কেন্দ্রগুলোকে অনেক প্রশাসনিক জটিলতা পোহাতে হয়।
আরও পড়ুনঃ সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীরা: অর্থনীতির চালিকাশক্তি, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার গল্প
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দূতাবাসগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই স্কুলগুলো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কেবল সিআইপি বা উচ্চপদস্থ প্রবাসীদের সন্তান নয়, সাধারণ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি স্কুলগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:
নিজস্ব ভবনের অভাব: অধিকাংশ স্কুল ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট বা বাণিজ্যিক ভবনে পরিচালিত হয়, যা স্থানীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মানদণ্ড পূরণ করে না।
শিক্ষক সংকট: বেতন কাঠামো আকর্ষণীয় না হওয়ায় যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে।
আইনি জটিলতা: বিদেশি মালিকানাধীন স্কুল হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কঠোর আইন ও উচ্চ ফি পরিশোধে হিমশিম খেতে হয়।
বই ও উপকরণের ঘাটতি: সময়মতো বাংলাদেশের পাঠ্যবই বিদেশের স্কুলগুলোতে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেতন ও খরচ বৃদ্ধি: প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় স্কুলগুলোর পরিচালনা ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশি স্কুলগুলো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বিদেশের মাটিতে আমাদের একখণ্ড জাতীয় পতাকা। এই স্কুলগুলো বন্ধ হওয়া মানে হলো একটি প্রজন্মের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হওয়া। সরকারের উচিত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে স্কুলগুলোর জন্য স্থায়ী জমি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া।











