নভেম্বর ৯, ২০২৬
#শ্রমবাজার

কোন দেশে যেতে কোন ভাষা শেখা এখন বাধ্যতামূলক?

বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা কিংবা নিশ্চিত ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর অধিকাংশ বাংলাদেশি তরুণের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ভাষা শেখা। গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে কেবল ইংরেজি জানলেই যে বিশ্ব হাতের মুঠোয় আসবে, সেই ধারণা এখন অনেকটাই ফিকে।

বর্তমান অভিবাসন ও শ্রমবাজারের সমীকরণে ইউরোপ থেকে এশিয়া—প্রতিটি দেশের দুয়ারে পৌঁছাতে এখন নির্দিষ্ট ভাষা শিক্ষা এক অপরিহার্য পাসপোর্টে পরিণত হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের মাটিতে নিজের দক্ষতা প্রমাণের প্রথম সোপান হলো সেই দেশের স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে পারা। ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলোর বাইরে যখন কোনো শিক্ষার্থী বা কর্মী পাড়ি জমান, তখন ভাষার দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে তার ভিসার নিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের হার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো তাদের ভাষা শিক্ষাকে অভিবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছে।

আরও পড়ুনঃ সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীরা: অর্থনীতির চালিকাশক্তি, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার গল্প

ইউরোপের অর্থনৈতিক পরাশক্তি জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি আবেদন করছেন। যদিও সেখানে অনেক কোর্স ইংরেজিতে পড়ানো হয়, তবুও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং পড়াশোনা শেষে পার্ট-টাইম বা ফুল-টাইম জবের জন্য ‘জার্মান ভাষা’ (Goethe-Zertifikat) জানা এখন অলিখিত নিয়ম।

বিশেষ করে বৃত্তির ক্ষেত্রে যারা অন্তত বি-ওয়ান (B1) লেভেল সম্পন্ন করেন, তারা অন্যদের তুলনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকেন। একই চিত্র দেখা যায় ফ্রান্সেও, যেখানে ফরাসি ভাষা ছাড়া সামাজিক ও পেশাদার জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

এশীয় শ্রমবাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার নাম। ই-৯ ভিসার আওতায় সরকারিভাবে কোরিয়ায় যেতে হলে ‘ইপিএস-টপিক’ (EPS-TOPIK) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। এটি কেবল একটি ভাষাগত পরীক্ষা নয়, বরং কোরিয়ান জীবনধারার সাথে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।

অন্যদিকে, জাপানের শ্রমবাজারে বর্তমানে নার্সিং ও কেয়ারগিভিং খাতে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেখানে জেএলপিটি (JLPT) এন-ফোর (N4) লেভেলের সনদ ছাড়া পা রাখা দায়।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘকাল ধরে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশিরা গেলেও, বর্তমানে সেখানেও দক্ষতার কদর বাড়ছে। সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশগুলোতে পেশাদার কাজের জন্য আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকা এখন নিয়োগকর্তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।

ভাষা জানা থাকলে একদিকে যেমন বেতন বেশি পাওয়ার সুযোগ থাকে, অন্যদিকে প্রবাসে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিও অনেকটা কমে আসে।

একনজরে দেশ ও প্রয়োজনীয় ভাষা দক্ষতার তালিকা:

  • জার্মানি: উচ্চশিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের জন্য জার্মান ভাষা (A1 থেকে C1 পর্যন্ত)।

  • দক্ষিণ কোরিয়া: সরকারিভাবে কাজের জন্য ইপিএস-টপিক (EPS-TOPIK) পাস করা বাধ্যতামূলক।

  • জাপান: পড়াশোনা ও বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিকের (SSW) জন্য JLPT বা NAT-TEST সনদ প্রয়োজন।

  • যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া: ইংরেজি দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আইইএলটিএস (IELTS), পিটিই (PTE) বা ডুয়েলিঙ্গো স্কোর বাধ্যতামূলক।

  • ইতালি ও স্পেন: নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাসের (PR) আবেদনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার বি-ওয়ান (B1) লেভেল সনদ আবশ্যিক।

বিদেশের মাটিতে আপনি কতটুকু সফল হবেন, তা কেবল আপনার ডিগ্রির ওপর নয়, বরং আপনার ভাষার ওপরও নির্ভর করে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি সংস্কৃতির হৃদস্পন্দন। যারা সময়ের দাবি মেনে আগেভাগেই ভাষা রপ্ত করছেন, বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে তারাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছেন।

কোন দেশে যেতে কোন ভাষা শেখা এখন বাধ্যতামূলক?

হার্ভার্ড-এমআইটি এখন আপনার ড্রয়িংরুমে!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *