প্রবাসীদের পরিবারের অদৃশ্য লড়াই: একাকীত্ব, মানসিক চাপ ও সামাজিক নিরাপত্তার সংকট

বিদেশে কর্মরত প্রিয়জনের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ভিত তৈরি করলেও দেশে থাকা প্রবাসী পরিবার প্রতিনিয়ত এক কঠিন মানসিক ও সামাজিক লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রবাসীরা যখন পরবাসে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তখন দেশে থাকা তাদের স্ত্রী, সন্তান কিংবা বয়োবৃদ্ধ মা-বাবাকে সামলাতে হয় একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অদৃশ্য পারিবারিক চাপ।
প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে দৈনন্দিন পারিবারিক দায়দায়িত্ব পালন এবং সামাজিক বিভিন্ন কটূক্তি ও বাধা পেরিয়ে টিকে থাকার এই সংগ্রাম সচরাচর লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে যায়।
জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ প্রতি মাসে মাইলফলক স্পর্শ করলেও তার পেছনের মানবিক গল্পগুলো বেশ করুণ। একজন প্রবাসী যখন বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করেন, তখন দেশে তার স্ত্রীর ওপর নেমে আসে পুরো সংসারের জটিল দায়িত্ব। একা হাতে সন্তান লালন-পালন করা, পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্যদের সেবা দেওয়া এবং ঘরের প্রতিটি সিদ্ধান্ত একা নিতে গিয়ে মানসিক চাপের চরম সীমানায় পৌঁছান তারা।
দীর্ঘদিন জীবনসঙ্গীর সান্নিধ্য না পাওয়া এবং প্রাত্যহিক আবেগ ভাগ করে নেওয়ার মানুষ না থাকায় এই পরিবারের সদস্যদের বড় অংশই তীব্র একাকীত্বে ভোগেন। প্রবাসীরা ফোনে যতটুকু যোগাযোগ রাখতে পারেন, তা দিয়ে জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতার শূন্যতা পুরোপুরি পূরণ হয় না। ফলে বাহ্যিক আর্থিক স্বচ্ছলতা দৃশ্যমান হলেও প্রবাসী পরিবার এর ভেতরের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেশ ভঙ্গুর থেকে যায়।
গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরে প্রবাসী স্বজনদের পরিবারগুলো প্রায়শই স্থানীয় নানামুখী সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে। বাড়িতে কোনো বয়স্ক পুরুষ অভিভাবক না থাকার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী বা অসৎ প্রতিবেশীরা তাদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা আর্থিক লেনদেনে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটে চলেছে।
তাছাড়া প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ সামলানোর ক্ষেত্রেও এসব পরিবারকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যাংকিং বা নিরাপদ আর্থিক বিনিয়োগের সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকায় অনেক সময় নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে প্রতারিত হন তারা। এতে পরিবারে নতুন অশান্তি তৈরি হয় এবং প্রবাসে থাকা স্বজনও দূর থেকে চরম মানসিক অস্থিরতায় দিন কাটান।
অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে একটি সন্তানের বেড়ে ওঠা কখনোই সহজ হয় না। শৈশব ও কৈশোরে বাবার প্রত্যক্ষ স্নেহ, শাসন ও সঠিক সামাজিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় অনেক সন্তানের মধ্যে আচরণগত জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। প্রবাসী পরিবারের সন্তানরা অনেক সময় মানসিক একাকীত্বে ভোগে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।
একই সাথে দীর্ঘ দিন পর পর যখন প্রবাসী বাবা দেশে ফেরেন, তখন সন্তানের কাছে তিনি যেন এক প্রকার দূরবর্তী মানুষ হয়ে থাকেন। বাবার সাথে স্বাভাবিক আবেগীয় মেলবন্ধন তৈরি হতে অনেক সময় লেগে যায়। এই মানসিক দূরত্ব কেবল সন্তানকেই প্রভাবিত করে না, বরং প্রবাসফেরত ব্যক্তিকেও মানসিকভাবে আঘাত করে এবং পারিবারিক সুসম্পর্কে ফাটল ধরায়।











