নভেম্বর ৯, ২০২৬
#প্রবাসীর পরিবার

বিদেশে উচ্চশিক্ষার মাঝে শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার আসল আইন ও বাস্তবতা

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দম্পতি পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা ওশেনিয়ার বিভিন্ন দেশে। দীর্ঘ কয়েক বছরের এই প্রবাস জীবনে অনেক শিক্ষার্থী দম্পতিই পরিবার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশে সন্তান জন্মদানের নিয়ম এবং তার নাগরিকত্বের জটিল সমীকরণটি সামনে চলে আসে। বিশ্বের সব দেশের আইন এক নয়; কোনো দেশে জন্ম নিলেই শিশু সরাসরি নাগরিক হয়ে যায়, আবার কোথাও বাবা-মায়ের ভিসার স্ট্যাটাসের ওপর নির্ভর করে শিশুর ভবিষ্যৎ। এই সংবেদনশীল অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন আইনের আলোকে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

বিশ্বের হাতেগোনা কিছু দেশে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি ইমিগ্রেশন আইন রয়েছে, যা ‘জুস সোলি’ বা বার্থরাইট সিটিজেনশিপ নামে পরিচিত। এই আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী দম্পতি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার ভূখণ্ডে সন্তান জন্ম দেন, তবে সেই শিশু জন্মসূত্রেই ওই দেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করে। এখানে বাবা-মা স্টুডেন্ট ভিসায় আছেন নাকি ট্যুরিস্ট ভিসায়, তা মোটেও বিবেচনা করা হয় না। তবে এই দেশগুলোতেও বিদেশে সন্তান জন্মদানের নিয়ম অনুযায়ী, শিশুর কারণে বাবা-মা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্থায়ী বসবাসের সুযোগ বা গ্রিন কার্ড পান না। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক (সাধারণত ১৮ বা ২১ বছর) হওয়ার পর বাবা-মায়ের জন্য স্পন্সরশিপের আবেদন করতে পারে।

যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং সেনজেনভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে আইন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব দেশে কেবল জন্মগ্রহণ করলেই কোনো শিশু নাগরিকত্ব পায় না, যাকে আইনি ভাষায় ‘জুস স্যাঙ্গুইনিস’ (Jus Sanguinis) বা রক্তের সম্পর্কভিত্তিক নাগরিকত্ব বলা হয়। এসব দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সন্তান জন্ম নিলে, শিশুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবা-মায়ের বর্তমান ভিসার স্ট্যাটাসটি লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট ভিসায় থাকা অবস্থায় সন্তান হলে সেও ডিপেন্ডেন্ট ভিসার আওতায় আসবে। তবে কিছু দেশে বাবা-মা যদি একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন অস্ট্রেলিয়ায় ১০ বছর) বৈধভাবে বসবাস করেন, তবে সন্তান পরবর্তীতে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারে।

বিদেশের মাটিতে সন্তান প্রসবের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক ও স্বাস্থ্য বীমার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করা উচিত। আমেরিকা বা কানাডার মতো দেশে কোনো উপযুক্ত হেলথ ইন্স্যুরেন্স ছাড়া সন্তান প্রসবের খরচ বহন করা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে অসম্ভব, যা হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্টুডেন্ট হেলথ ইন্স্যুরেন্স প্ল্যানে মাতৃত্বকালীন (Maternity) খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে, আবার কিছু দেশে এটি আলাদাভাবে প্রিমিয়াম দিয়ে যুক্ত করতে হয়। তাই বিদেশে সন্তান জন্মদানের নিয়ম ও খরচের ধাক্কা সামলাতে গর্ভধারণের আগেই ইন্স্যুরেন্স পলিসিটি নিখুঁতভাবে পড়ে নেওয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সন্তান জন্মের পর প্রথম কাজ হলো স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটি বা হাসপাতাল থেকে অফিশিয়াল বার্থ সার্টিফিকেট (জন্ম নিবন্ধন) সংগ্রহ করা। যদি দেশটি স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব না দেয়, তবে বাবা-মাকে অবিলম্বে সেই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে শিশুর জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করে ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়। মনে রাখতে হবে, বৈধ পাসপোর্ট এবং সঠিক ডিপেন্ডেন্ট ভিসা ছাড়া নবজাতককে নিয়ে নিজ দেশে ভ্রমণ করা কিংবা প্রবাসে অবস্থান করা সম্পূর্ণ অবৈধ।

কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের (Jus Soli) আইন রয়েছে। তাই বাবা-মা স্টুডেন্ট ভিসায় থাকলেও শিশুটি জন্ম নেওয়া মাত্রই ওই দেশের বৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে এবং তার পাসপোর্টের আবেদন করা যাবে।

যুক্তরাজ্যে কেবল জন্ম নিলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। নবজাতক শিশুটি বাবা-মায়ের বর্তমান স্টুডেন্ট ভিসার অধীনে ‘ডিপেন্ডেন্ট’ হিসেবে থাকবে। তবে বাবা-মা যদি পরবর্তীতে পিআর বা সেটেলমেন্ট পান, তখন সন্তানের নাগরিকত্বের পথ সুগম হয়।

বাংলাদেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব সমর্থন করে। সন্তান যদি আমেরিকা বা কানাডার নাগরিকত্বও পায়, তবুও সে বাবা-মায়ের সূত্র ধরে রক্তগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অধিকার বজায় রাখতে পারবে। এর জন্য বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ডুয়াল সাইট সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট নেওয়া যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *