পরবাসে জীবনের বিষণ্ণ একাকীত্ব বনাম নাড়ির টানে দেশে ফেরা

জীবনের উজ্জ্বল মধ্যাহ্নে যারা একদিন জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন, জীবনের গোধূলিবেলায় এসে তারা আজ এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। উন্নত বিশ্বের ঝকঝকে জীবনের আড়ালে প্রবাসে বয়োজ্যেষ্ঠ বাংলাদেশিদের মধ্যে বাড়ছে তীব্র একাকীত্ব ও মানসিক সংকট। বিদেশের ‘ওল্ড হোম’ বা কেয়ার সেন্টারের যান্ত্রিক সেবা, নাকি দেশের চিরচেনা ধুলোবালি; এই দোটানাই এখন প্রবাসী প্রবীণদের প্রধান উদ্বেগের কারণ।
ইউরোপ বা আমেরিকার ব্যস্ত জীবনে সময় যেন এক মহার্ঘ বস্তু। সেখানে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানদের যান্ত্রিক জীবনে বাবা-মায়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে যে সন্তানদের জন্য একদিন ঘরবাড়ি ছেড়েছিলেন, শেষ বয়সে এসে তাদেরই ড্রয়িংরুমের কোণে অথবা আধুনিক কোনো ওল্ড হোমে নিজেকে আবিষ্কৃত করছেন অনেক প্রবাসী। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল শারীরিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং মানসিকও। বিদেশের তুষারপাত কিংবা হিটারের কৃত্রিম ওম অনেক সময়ই দেশের রোদেলা দুপুরের উষ্ণতার অভাব পূরণ করতে পারে না।
আরও পড়ুনঃ নীল খাম থেকে পিক্সেলের দূরত্ব; প্রবাসীদের একাকীত্বে ভিডিও কলের প্রলেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসে প্রবীণদের এই একাকীত্ব কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি নীরব মহামারীতে রূপ নিচ্ছে। ভাষার সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয়দের সাথে সামাজিকীকরণের অভাবে অনেকেই বিষণ্ণতা ও স্মৃতিভ্রমের (ডিমেনশিয়া) মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
উন্নত বিশ্বে বৃদ্ধনিবাস বা ‘রিটায়ারমেন্ট ভিলেজ’ ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় এবং সেখানকার সেবার মানও ঈর্ষণীয়। সার্বক্ষণিক নার্সিং সেবা, উন্নত চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সেখানে নিশ্চিত। কিন্তু একজন বাঙালির কাছে শেষ জীবনের চাওয়া কেবল ওষুধ বা ডায়েট চার্ট নয়; বরং নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করা কিংবা পরিচিত প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈকালিক আড্ডা।
ঠিক এই জায়গাতেই জন্ম নিচ্ছে ‘রিভার্স মাইগ্রেশন’ বা দেশে ফেরার আকুতি। অনেক প্রবাসী এখন পেনশনের টাকা নিয়ে দেশে ফিরে নিজের গ্রামে বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আবাসন প্রকল্পে শেষ জীবন কাটানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে দীর্ঘ কয়েক দশক বিদেশে থাকার পর দেশের বদলে যাওয়া পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াটাও এক বড় চ্যালেঞ্জ।
এক নজরে প্রবাসে শেষ বয়সের বাস্তবতাঃ
সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা: বিদেশের ওল্ড হোমগুলোতে পশ্চিমা খাবার ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা অনেক বাঙালির জন্য বড় যন্ত্রণার কারণ।
চিকিৎসা ও খরচ: বিদেশের ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিমার সুবিধা থাকলেও আপনজনদের সান্নিধ্যের অভাব মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।
পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন: একান্নবর্তী পরিবারের ঐতিহ্য ভেঙে প্রবাসে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি কালচার প্রবীণদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলছে।
দেশের পরিবেশ: বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য ডে-কেয়ার বা বিশেষায়িত আবাসনের অভাব দেশে ফেরার পথে অন্যতম অন্তরায়।
অনেকেই এখন মাঝামাঝি একটি পথ খুঁজছেন। বছরের অর্ধেক সময় বিদেশে সন্তানদের সাথে এবং বাকি অর্ধেক সময় দেশের মাটিতে কাটানো। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য বাংলাদেশেও এখন পশ্চিমা আদলে কিন্তু দেশীয় সাংস্কৃতিক আবহে ‘সিনিয়র সিটিজেন হোম’ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি থাকবে বাঙালির পরিচিত সামাজিক পরিবেশ।











