প্রবাসীদের চিকিৎসা সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা এখন সময়ের দাবি

বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন ও উপার্জনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ ইন্স্যুরেন্স’ বা স্বাস্থ্য বীমা চালু করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের মাটিতে আকস্মিক অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও চড়া চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কা থেকে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষায় সরকারের নীতিগত উদ্যোগ ও এর দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেন প্রবাসীরা। অথচ যে মানুষগুলো দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশে টাকা পাঠান, তাঁদের নিজেদের শরীরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ সবচেয়ে কম। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা দূর ইউরোপে অবস্থানরত সাধারণ শ্রমিকদের একটি বড় অংশই অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করেন।
এর ওপর রয়েছে কাজের তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপ। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ কোনো বড় অসুখ বা দুর্ঘটনা ঘটলে তা প্রবাসীর পুরো পরিবারের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।
সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ দেড় দশকে এমন বহু নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছি, যেখানে সামান্য অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা হৃদরোগের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে একজন প্রবাসীকে তাঁর সারাজীবনের সঞ্চয় বিলিয়ে দিতে হয়েছে, কিংবা দেশে থাকা পরিবারকে পৈত্রিক ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে।
অনেক সময় দেখা যায়, নিয়োগকর্তা বা কফিল চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় না, আর প্রবাসী শ্রমিকের পকেটে থাকে না কোনো অতিরিক্ত অর্থ। এই অসহায়ত্ব দূর করার একমাত্র মোক্ষম হাতিয়ার হলো একটি শক্তিশালী ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা।
যেভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব এই চিকিৎসা সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করার প্রক্রিয়াটি খুব বেশি জটিল নয়। এটি প্রধানত দুইভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথমত, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ড নেওয়ার সময় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কল্যাণ তহবিলের সাথে একটি নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরাসরি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় চিকিৎসা বীমা কোম্পানি অথবা আন্তর্জাতিক ইন্স্যুরেন্স জায়ান্টদের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে পারে। এর ফলে প্রবাসীরা নামমাত্র মূল্যে বা সরকারি ভর্তুকিতে ক্যাশলেস (নগদ টাকাহীন) চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, হাসপাতালে ভর্তি হলে কার্ড দেখালেই মিলবে সব আধুনিক সেবা, পকেট থেকে একটি টাকাও গুনতে হবে না। এতে করে প্রবাসী শ্রমিকেরা যেমন নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন, তেমনি দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর গতিও থাকবে নির্বিঘ্ন।
প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা বাস্তবায়নের মূল সুফলসমূহ:
শতভাগ আর্থিক নিরাপত্তা: যেকোনো বড় ধরনের অপারেশন, হৃদরোগ বা ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ সরাসরি বীমা কোম্পানি বহন করবে।
ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধা: দূর পরবাসে পকেটে নগদ টাকা না থাকলেও শুধু ইন্স্যুরেন্স কার্ড বা ডিজিটাল আইডি দেখিয়ে হাসপাতালে তাৎক্ষণিক ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ।
দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ: কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে কোনো বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করলে প্রবাসী বা তাঁর পরিবারকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।
মানসিক স্বস্তি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি: চিকিৎসার খরচের দুশ্চিন্তা না থাকায় প্রবাসীরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন, যা পরোক্ষভাবে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
২০২৬ সালের এই আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের কেবল প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের অঙ্কেই খুশি থাকলে চলবে না; তাঁদের জীবনের মান উন্নত করার দায়িত্বও নিতে হবে। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই এই স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বীমা প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত এবং সহজে দাবি আদায়ের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যেন সাধারণ শ্রমিকেরা এর আসল সুফল পান।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের শরীর ও মন সুস্থ থাকলে তবেই সচল থাকবে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা। প্রবাসীদের নিরাপদ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে এই স্বাস্থ্য বীমার দ্রুত ও সফল বাস্তবায়নই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।










