প্রবাসীদের শেষ যাত্রার ভোগান্তি কমাতে যেসব আমূল পরিবর্তন জরুরি!

জীবিকার তাগিদে প্রবাসে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনায় এখনো রয়ে গেছে অন্তহীন জটিলতা। বিদেশের মাটিতে স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি দূতাবাস ও বিমানবন্দরের আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় মৃতদেহ দেশে আনার পুরো প্রক্রিয়াটিকে সহজ, দ্রুত ও মানবিক করতে অবিলম্বে কাঠামোগত নীতি পরিবর্তনের দাবি জোরদার হচ্ছে।
কফিনের আড়ালে ঢাকা পড়া নির্মম নিষ্ঠুরতা
যাঁরা জীবদ্দশায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিজেদের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দেন, মৃত্যুর পর তাঁদের শেষ ইচ্ছা থাকে মাতৃভূমির মাটিতে শায়িত হওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একজন প্রবাসী মারা যাওয়ার পর তাঁর মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছাতে এখনো লেগে যায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনো আবার মাসের পর মাস। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা ইউরোপ—সবখানেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর পর শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং অসমাপ্ত আইনি ও দাপ্তরিক লড়াই।
সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ দেড় দশকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে কফিনের জন্য অপেক্ষারত স্বজনদের যে বুকফাটা আর্তনাদ আমি দেখেছি, তা যেকোনো সুস্থ মানুষকে নাড়া দিতে বাধ্য। বিদেশের হাসপাতাল থেকে এনওসি (আপত্তিহীনতা সনদ), ডেথ সার্টিফিকেট, দূতাবাসের ক্লিয়ারেন্স থেকে শুরু করে এয়ারলাইন্সের টিকিট বুকিং—প্রতিটি ধাপে দালালের দৌরাত্ম্য আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্য যেন এক অলিখিত নিয়ম। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও এই প্রাচীন ও জটিল ব্যবস্থার কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়া আমাদের পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ডিজিটাল উইন্ডো ও রাষ্ট্রীয় খরচের গ্যারান্টি
বর্তমান বাস্তবতায় এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমত প্রতিটি দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি ‘ডেডিকেটেড ডেথ কেস সেল’ বা বিশেষ ইউনিট গঠন করা দরকার। কোনো প্রবাসীর মৃত্যুর খবর আসামাত্রই এই সেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করবে।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় বিমান ভাড়া এবং অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত কর্মীরা কিছু সহায়তা পেলেও, যাঁরা অনিয়মিত বা কাগজহীন, তাঁদের মরদেহ নিয়ে দূতাবাসগুলোর গড়িমসি চরম অমানবিক। রাষ্ট্র যেখানে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে টিকে আছে, সেখানে বৈধ-অবৈধের বৈষম্য ভুলে প্রতিটি নাগরিকের মরদেহ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে এবং রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজে দেশে আনার স্থায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রক্রিয়াটি সহজ করতে যে ৪টি পরিবর্তন আনা বাধ্যতামূলক:
ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল পোর্টাল: দূতাবাস, হাসপাতাল এবং কুরিয়ার সার্ভিসকে একটি মাত্র ডিজিটাল নেটওয়ার্কে আনা, যাতে কাগজের ফাইলের গতিতে কোনো মরদেহ আটকে না থাকে।
বিনামূল্যে বিমান পরিবহন সুবিধা: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতিটি ফ্লাইটে প্রবাসীদের মরদেহ বহনের জন্য বাধ্যতামূলক কোটা রাখা এবং তা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা।
আইনি জটিলতা নিরসনে দ্রুত ফান্ড: বিদেশের মাটিতে ময়নাতদন্ত বা নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি লড়াইয়ের খরচ সরাসরি কল্যাণ বোর্ড থেকে তাৎক্ষণিক প্রদান।
বিমানবন্দরে দ্রুত খালাস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা: কার্গো ভিলেজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কফিন আটকে না রেখে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে লাশ হস্তান্তর এবং স্বজনদের বাড়িতে পৌঁছাতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা।
একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়
একজন প্রবাসী বেঁচে থাকতে রাষ্ট্রকে যা দেন, মৃত্যুর পর রাষ্ট্র তাঁর জন্য সামান্য কনস্যুলার সেবাটুকু মসৃণ করতে পারবে না—তা হতে পারে না। প্রবাসীদের শেষ যাত্রার এই ভোগান্তি দূর করতে কেবল আশ্বাস নয়, দরকার দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
আমরা যদি প্রবাসীদের কফিন চেনার প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড করতে পারি এবং দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করা হবে।
মাতৃভূমির টানে ঘাম ঝরানো এই মানুষদের শেষ যাত্রা যেন অন্তত সসম্মানে এবং দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়, একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে সেই নিশ্চয়তা আমাদের দিতেই হবে।











