মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শ্রম আইন কি বাংলাদেশিদের জন্য আশীর্বাদ নাকি চ্যালেঞ্জ?

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার, চুক্তি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আমূল পরিবর্তন এনেছে নতুন শ্রম আইন। এই আইনি সংস্কারের ফলে অঞ্চলটিতে কর্মরত প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বেতন কাঠামো ও কফিল বা নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সনাতন ‘কফিল’ বা স্পন্সরশিপ প্রথা, যা অনেক ক্ষেত্রে দাসত্বের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে সমালোচিত হতো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই প্রথা শিথিল করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নতুন শ্রম আইন কার্যকর করেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলো। এখন থেকে একজন শ্রমিক তার চুক্তি শেষ হলে বা নিয়োগকর্তা চুক্তি লঙ্ঘন করলে, পূর্ববর্তী কফিলের অনুমতি ছাড়াই অন্য কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারবেন।
সাংবাদিক হিসেবে গত ১৫ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে দেখেছি। এবারের এই আইনি পরিবর্তনকে এক বিশাল প্যারাডাইম শিফট বা কাঠামোগত রূপান্তর বলা চলে। এতদিন যে বাংলাদেশিরা নিয়োগকর্তার খামখেয়ালির ভয়ে মুখ বুজে সব অন্যায় সহ্য করতেন, নতুন আইন তাদের আইনি সুরক্ষা ও দরকষাকষির এক নতুন হাতিয়ার দিয়েছে। তবে মুদ্রার ওপিঠও আছে—দক্ষতার অভাব থাকলে এই নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
পেশাদারিত্বের কড়া বার্তা ও বেতন সুরক্ষার গ্যারান্টি
নতুন আইনের আরেকটি বড় দিক হলো ‘ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেম’ বা বেতন সুরক্ষা কার্যক্রমের কঠোর বাস্তবায়ন। কোনো কোম্পানি বা নিয়োগকর্তা এখন আর চাইলেই শ্রমিকের বেতন আটকে রাখতে পারবে না। সরাসরি ব্যাংকিং বা অনুমোদিত ইলেকট্রনিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে বেতন পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে করে বছরের পর বছর ধরে চলা বকেয়া বেতনের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে একই সাথে এই আইন বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ‘ডিজিটালাইজেশন’ এবং ‘জাতীয়করণ’ (যেমন সৌদিকরণ)-এর দিকে হাঁটছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকের মতো প্রথাগত কাজের পরিধি সংকুচিত করে আনা হচ্ছে। নতুন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পেশাগত লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট দক্ষতা না থাকলে আকামা (কাজের অনুমতিপত্র) নবায়ন করা যাবে না।
নতুন শ্রম আইনের প্রধান প্রধান দিক ও প্রভাব:
মুক্ত কর্মসংস্থান: চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ শেষে নিয়োগকর্তার কোনো ‘এনওসি’ (আপত্তিহীনতার সনদ) ছাড়াই প্রবাসীরা নতুন চাকরি বেছে নিতে পারবেন।
ডিজিটাল চুক্তিপত্র: মৌখিক বা কাগজের ভুয়া চুক্তির দিন শেষ; সব চুক্তি এখন সরকারি ডিজিটাল পোর্টালে নিবন্ধিত হতে হবে, যা শ্রমিককে আইনি সুরক্ষা দেবে।
বেতন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা: শতভাগ বেতন ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হবে।
দক্ষতার পরীক্ষা: নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি পেশার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা (স্কিল ভেরিফিকেশন) পাস করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন শ্রম আইন আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য একাধারে যেমন অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, ঠিক তেমনি এনেছে কঠোর এক বাস্তবতার মুখোমুখি। দালালদের খপ্পরে পড়ে ‘ফ্রি ভিসা’র নামে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের যে চোরাবালি, তা এই কঠোর আইনি কাঠামোতে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের নিজেদের ভেতরের প্রস্তুতি বদলানোর। আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি ও সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে প্রথাগত শ্রমিক তৈরির মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল, আইটি বা কেয়ারগিভিংয়ের মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে পাঠাতে পারি, তবেই এই নতুন শ্রম আইন আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। অন্যথায়, এই বিশাল শ্রমবাজার আমাদের হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।











