নভেম্বর ৯, ২০২৬
#জীবনযাপন #প্রবাসীর গল্প #সংগ্রাম

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ‘বর্ম’ প্রবাসী আয়: সানেমের গবেষণা

দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান খোঁজা পরিবারের তুলনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর দারিদ্র্যসীমার নিচে নামার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কম। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসী আয় কেবল বিলাসিতা নয়, বরং চরম অর্থনৈতিক সংকটে একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ বা ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে।

গবেষণাটি মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক অভিবাসনের তুলনামূলক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সানেমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যারা কাজের সন্ধানে দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তরিত হন, তাদের পরিবারের তুলনায় যারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, তাদের পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা অনেক বেশি সুদৃঢ়।

বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী চলমান মূল্যস্ফীতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের পরিবারগুলো অনেক বেশি সক্ষম।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ফলে আসা অর্থ সরাসরি একটি পরিবারের ভোগ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এটি কেবল খাদ্যের গুণগত মানই নিশ্চিত করে না, বরং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে বিনিয়োগ করার সক্ষমতা তৈরি করে।

অন্যদিকে, দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হওয়া শ্রমিকদের আয় অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মিত এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য হওয়ায় তারা প্রায়শই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে থাকেন।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করে। যখন একটি পরিবার বিদেশের টাকা পায়, তখন তারা স্থানীয় বাজারে খরচ করে, যা পরোক্ষভাবে ওই এলাকার অ-অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডলারের বিনিময় হার এবং জীবনযাত্রার উচ্চমূল্যের কারণে এই আয়ের গুরুত্ব এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দুর্যোগের সময় ‘বীমা’ হিসেবে কাজ করে। বন্যা বা মহামারির মতো সময়ে যখন দেশের অভ্যন্তরীণ আয়ের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ পাঠিয়ে পরিবারকে সুরক্ষা দেন। একে গবেষণায় ‘রেজিলিয়েন্স’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার মূল নির্যাস:

  • ঝুঁকি হ্রাস: অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের তুলনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর দারিদ্র্যসীমার নিচে যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কম।

  • অর্থনৈতিক ঢাল: মূল্যস্ফীতির সময়ে রেমিট্যান্স প্রান্তিক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

  • বিনিয়োগের ধরণ: প্রবাসী পরিবারগুলো আয়ের একটি বড় অংশ জমি কেনা, গৃহনির্মাণ এবং ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের সুরক্ষা দেয়।

  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার হার এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা সাধারণ পরিবারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তবে সানেম তাদের প্রতিবেদনে কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছে। গবেষকদের মতে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় উচ্চ খরচ বা দালালের খপ্পরে পড়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে বিদেশে যায়। শুরুর দিকের এই বিশাল ঋণ অনেক সময় প্রবাস জীবনের প্রথম কয়েক বছরের আয় গিলে ফেলে। তাই অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে দারিদ্র্য বিমোচনে এর প্রভাব আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ‘বর্ম’ প্রবাসী আয়: সানেমের গবেষণা

প্রবাসীদের জন্য টাকা পাঠানোর সেরা সময় কোনটি?

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ‘বর্ম’ প্রবাসী আয়: সানেমের গবেষণা

বিদেশের মাটিতে আটকে পড়া প্রবাসীদের ফেরাতে সরকার

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *