‘অভিবাসন ব্যয় কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ’

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স। তবে এই খাতের অন্ধকার দিক হলো আকাশচুম্বী অভিবাসন ব্যয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই ক্ষতে সরাসরি হাত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
বুধবার সচিবালয়ে প্রথম কার্যদিবসে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিদেশগামী কর্মীদের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা বরদাশত করা হবে হবে না এবং অভিবাসন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনাই হবে তাঁর মন্ত্রণালয়ের এক নম্বর অগ্রাধিকার।
‘গয়না ও জমি বিক্রি করে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে’
বুধবার সকালে মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিতিমূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে, যারা বিদেশে যান তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা-বোনের গয়না কিংবা শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান। তাদের সঙ্গে যখন কেউ প্রতারণা করে বা কাজের নামে ভুয়া কাগজ ধরিয়ে দেয়, তখন সেটি শুধু একজনের সঙ্গে নয়, একটি পরিবারের সঙ্গে বেইমানি করা হয়।”
নুরুল হক নুর আরও বলেন, “সবার আগে আমাদের লক্ষ্য থাকবে প্রতারণা বন্ধ করা। যারা মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব। পাশাপাশি, অভিবাসন ব্যয় কেন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে বেশি, তার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অগ্রাধিকার তালিকায় ‘১৮০ দিনের রোডম্যাপ’
নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে প্রথম ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী নুর জানিয়েছেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই সময়ের মধ্যে প্রধানত তিনটি বিষয় প্রাধান্য পাবে:
১. প্রতারণা নির্মূল: লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং অবৈধ দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমানো।
২. ব্যয় সংকোচন: অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে এনে একটি সহনীয় কাঠামো দাঁড় করানো।
৩. সুবিধা নিশ্চিতকরণ: বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ এবং বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোর মাধ্যমে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা।
মন্ত্রণালয়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক
অভিবাসন ব্যয়: প্রতিবেশী দেশগুলোর সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা।
হেল্প ডেস্ক: বিমানবন্দরে প্রবাসীদের স্বাগত জানাতে এবং সহায়তা করতে ‘সাপোর্ট ডেস্ক’ শক্তিশালী করা।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণ: মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন বাজার অনুসন্ধান।
রেমিট্যান্স প্রবাহ: বৈধ পথে টাকা পাঠাতে প্রবাসীদের প্রণোদনা ও সচেতনতা বাড়ানো।
দক্ষতা উন্নয়ন: বিদেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের ভাবনা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ এই নেতার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের ‘সিন্ডিকেট’ প্রথা ভেঙে অভিবাসন ব্যয় কমানো খুব একটা সহজ হবে না। তবে নুরের মতো একজন লড়াকু ব্যক্তিত্ব যদি কঠোর অবস্থানে থাকেন, তবে সাধারণ কর্মীদের মনে আশার সঞ্চার হবে।
বিশেষ করে রমজান মাস শুরু হওয়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ যেমন বাড়বে, তেমনি ঈদে ঘরে ফেরার সংখ্যাও বাড়বে। এই সময়ে বিমানবন্দরে প্রবাসীদের যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি পোহাতে না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
পরিশেষে, নুরুল হক নুরের হাত ধরে প্রবাসী শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তিনি যদি তাঁর ঘোষিত ‘ম্যাজিক’ দিয়ে অভিবাসন ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে পারেন, তবে তা হবে দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।











