নভেম্বর ৯, ২০২৬
#জাতীয় #শ্রমবাজার

মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় নজর বাংলাদেশের

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর থাকা বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে এখন বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, যেখানে টেকসই অর্থনৈতিক সুরক্ষায় দক্ষ কর্মী পাঠাতে জোরেশোরে খোঁজা হচ্ছে নতুন শ্রমবাজার। সনাতনী গন্তব্যের বাইরে গিয়ে সরকার ও রিক্রুটিং খাত এখন নজর দিচ্ছে পূর্ব ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে। বিশেষ করে রোমানিয়া, ইতালি, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ায় তৈরি হয়েছে নতুন আশা।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে বেতন কাঠামো স্থবির হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের নীতি জোরদার হয়েছে। এছাড়া উচ্চ অভিবাসন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক কর্মী কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না। ফলে একক অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল থাকার ঝুঁকি দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ভর করে থাকা জাতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। ভূরাজনীতি ও তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি যেকোনো সময় অস্থিরতায় পড়তে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান কর্তৃপক্ষ এখন নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলে কর্মীদের টেকসই পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে।

পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে তীব্র শ্রমিক সংকট বাংলাদেশের সামনে এক অনন্য দুয়ার খুলে দিয়েছে। রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোর বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী পশ্চিম ইউরোপে পাড়ি জমানোয় সেখানে নির্মাণ, উৎপাদন, ডেলিভারি ও রেস্তোরাঁ খাতে স্থানীয় কর্মী মিলছে না। এছাড়া ইতালিও কৃষিসহ বিভিন্ন মৌসুমি ও অ-মৌসুমি খাতে নির্দিষ্ট কোটায় কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপের কর্মক্ষেত্রগুলোতে কাজের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো এবং মজুরি নির্ধারিত হয় স্থানীয় শ্রম আইন অনুযায়ী। তবে সেখানে কাজ পেতে হলে অভিবাসন ও ভিসা সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মানতে হয়। দালাল চক্রের অপতৎপরতা রুখে সরকার যদি সরাসরি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক করতে পারে, তবে ইউরোপে নতুন শ্রমবাজার তৈরি স্থায়ী রূপ পাবে।

পূর্ব এশিয়ার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আকর্ষণীয় উপার্জনের গন্তব্য হিসেবে দ্রুত এগিয়ে আসছে। জাপানের ‘স্পেসিফাইড স্কিল্ড ওয়ার্কার’ (এসএসডব্লিউ) এবং টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপের আওতায় নার্সিং কেয়ার, নির্মাণ ও কৃষি খাতে কর্মী নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারিভাবে ‘এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম’ বা ইপিএস-এর মাধ্যমে উৎপাদন ও কৃষি খাতে প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি যাচ্ছেন।

তবে অদক্ষ শ্রমিকের দিন শেষ হয়ে আসায় পূর্ব এশিয়ার এই নতুন শ্রমবাজার মূলত মেধা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এখানে কাজের প্রধান শর্তই হলো ভাষা শিক্ষা ও নির্দিষ্ট ট্রেডে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রফিসিয়েন্সি টেস্ট কিংবা কোরিয়ান ভাষার টপিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাড়া আবেদন করারও সুযোগ নেই। ফলে জেলা পর্যায়ের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে ঢেলে সাজানোর দাবি উঠছে।

সম্ভাবনা অনেক থাকলেও প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক কিছু বড় জটিলতা এখনো কাটেনি। ইউরোপের অনেক দেশের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস বাংলাদেশে না থাকায় কর্মীদের ভিসার আবেদনের জন্য ভারতে যেতে হয়। এতে অভিবাসন ব্যয় ও সময় দুটোই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভিসা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশি নিয়োগকর্তারা চাহিদা বাতিল করে অন্য দেশের কর্মী নিয়ে নেন।

এই সংকট কাটাতে ঢাকায় ইউরোপীয় দেশগুলোর ভিসা কনস্যুলেট বা আবেদন কেন্দ্র স্থাপনে কূটনৈতিক দেনদরবার জোরদার করা প্রয়োজন। একই সাথে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের প্রবণতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে যেকোনো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার শুরুতেই ভেস্তে যেতে পারে।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তরের ফলে সাধারণ কায়িক শ্রমের চাহিদা প্রতিনিয়ত কমছে। আগামী দিনগুলোতে আইটি, আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় দক্ষ কর্মীরাই বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেবেন। তাই সনাতনী ধারার প্রশিক্ষণ বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সনদায়ন পদ্ধতি চালু করা ছাড়া উপায় নেই।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *