বাজেটে উপেক্ষিত প্রবাসীরা

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রবাসী ও অভিবাসন খাতের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ১ শতাংশেরও কম রাখা হয়েছে, যা প্রবাসীদের জন্য হতাশাজনক। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও অভিবাসন খাত কেন বরাবরই বাজেটে প্রান্তিক অবস্থানে থাকবে, তা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
মে ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রবাসীরা কেবল এক মাসেই রেকর্ড ৩.৪৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫.৩৪% বেশি। ডলার সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন বড় পরীক্ষা দিচ্ছে, তখন এই প্রবাসীদের রক্ত পানি করা অর্থই দেশের মূল ভরসা। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে, সেখানে এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’দের প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতি বছরই জাতীয় বাজেটে অভিবাসন খাতের বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ০.৫ থেকে ০.১৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রবাসীদের পাঠানো শত কোটি ডলারের বিপরীতে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষা কিংবা ভাষাজ্ঞান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন কমছে। বিশ্বের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের দরকার দক্ষ জনশক্তি। কিন্তু সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কেনার জন্য যে পরিমাণ বাজেট প্রয়োজন, তা এই খসড়া বাজেটে পুরোপুরি উপেক্ষিত। এ কারনে বেশিরভাগ কর্মীই কম বেতনে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রবাসীরা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’র উপাধি পেলেও, দেশের মাটিতে পা রাখতেই তাঁদের কপালে জোটে অবহেলা। বিমানবন্দরগুলোতে সাধারণ প্রবাসীদের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয়, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার বিমান টিকিট ও সামগ্রিক অভিবাসন খরচ আকাশচুম্বী। এই খরচের বোঝা কমানোর কোনো কার্যকর রোডম্যাপ এবারের বাজেটে নেই।
সবথেকে দুঃখজনক বিষয় হলো সামাজিক নিরাপত্তা। একজন প্রবাসী ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বিদেশে সব হারিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। কিন্তু প্রবাস জীবন শেষে যখন তিনি শূন্য হাতে দেশে ফেরেন, তখন তাঁর জন্য কোনো সরকারি পেনশন বা এককালীন পুনর্বাসন ভাতার ব্যবস্থা করা হয় না। প্রতি বছরই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানোর অনেক গল্প থাকলেও প্রবাসী পরিবারগুলোকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো জোরালো উদ্যোগ দেখা যায় না।
প্রবাসীদের আমরা কেবল একটি ‘সংখ্যা’ বা ‘ডলারের মেশিন’ হিসেবে দেখতে পারি না। তারা এই দেশের আসল নায়ক। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের ওপর বিনিয়োগ করলে তা কখনো বিফলে যায় না। অভিবাসন খাতের বাজেট যদি মোট বাজেটের অন্তত ১ শতাংশে উন্নীত না করা হয়, তবে দক্ষ কর্মী তৈরি এবং আগামী দিনে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এজন্য প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত করার আগে প্রবাসীদের কল্যাণ এবং পুনর্বাসনে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।









