ফরাসি মেধার ‘দুর্গ’ ইকোল পলিটেকনিক

প্যারিসের কোলাহল ছাড়িয়ে দক্ষিণ উপকণ্ঠের পালাইজো মালভূমিতে অবস্থিত এক অনন্য বিদ্যাপীঠ, যা গত দুই শতাব্দী ধরে ফ্রান্সের ভাগ্য নির্ধারণ করছে। ১৭৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইকোল পলিটেকনিক’ (École Polytechnique), যা ‘এল এক্স’ (L’X) নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত, বর্তমানে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাত ধরে সামরিক একাডেমি হিসেবে শুরু হলেও, এটি এখন বৈশ্বিক উদ্ভাবনের প্রধানতম কেন্দ্র।
ইকোল পলিটেকনিকের বিশেষত্ব হলো এর ভর্তি প্রক্রিয়া। ফ্রান্সের ‘গ্রঁদ একোল’ (Grandes Écoles) ব্যবস্থার চূড়ায় থাকা এই প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়া যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে গণ্য হয়। এখানকার ‘ইনজেনিওর পলিটেকনিশিয়ান’ প্রোগ্রামটি বিশ্বখ্যাত, যেখানে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত জটিল তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি সামরিক শৃঙ্খলার একটি অদ্ভুত সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।
প্রতিষ্ঠানটি কেবল মেধাবী ছাত্র তৈরি করে না, বরং এটি ‘নেতা’ তৈরি করে। এখানকার শিক্ষার্থীরা আজ ফ্রান্সের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এলিসি প্রাসাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সুগভীর চেতনা গেঁথে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ স্বপ্নের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস: প্রবাস জীবনের অজানা সংগ্রামের গল্প
পালাইজো ক্যাম্পাসটি বর্তমানে ‘প্যারিস-স্যাকলে’ ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত, যা ইউরোপের বৃহত্তম গবেষণা হাব। এখানে পা রাখলে মনে হবে আপনি কোনো ভবিষ্যৎ নগরীতে প্রবেশ করেছেন। এখানকার ল্যাবরেটরিগুলোতে কোয়ান্টাম ফিজিক্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকারের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দিনরাত গবেষণা চলছে।
র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, উদ্ভাবনী সক্ষমতায় ইকোল পলিটেকনিক নিয়মিতভাবে বিশ্বের সেরা দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নিজের স্থান করে নেয়। তবে কেবল র্যাঙ্কিং নয়, এর প্রকৃত শক্তি হলো এর অ্যালুমনাই নেটওয়ার্ক। ফ্রান্সের তিন জন প্রেসিডেন্ট, অসংখ্য নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এবং ফরচুন ৫০০ তালিকার অনেক সিইও এই আঙিনারই সন্তান।
একনজরে ইকোল পলিটেকনিক
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৭৯৪ সাল (ফরাসি বিপ্লবের সময়)।
অবস্থান: পালাইজো (প্যারিসের অদূরে), ফ্রান্স।
মটো: ‘দেশের জন্য, বিজ্ঞানের জন্য এবং গৌরবের জন্য’ (Pour la Patrie, les Sciences et la Gloire)।
র্যাঙ্কিং: প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে ইউরোপের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং উদ্ভাবনী শক্তিতে বিশ্বসেরা।
বিখ্যাত অ্যালুমনাই: অঁরি পোয়াঁকারে (গণিতবিদ), মারি ফ্রাঁসোয়া সাদি কার্নো (সাবেক প্রেসিডেন্ট), এবং বার্নার্ড আরনল্ট (এলভিএমএইচ-এর সিইও)।
গবেষণা: ২৩টি বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি যা সরাসরি ফরাসি জাতীয় গবেষণা সংস্থার (CNRS) সাথে যুক্ত।
বাংলাদেশের উদীয়মান মেধাবীরা যারা মূলত গণিত ও বিজ্ঞানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চান, তাদের জন্য ইকোল পলিটেকনিক হতে পারে এক অবারিত দিগন্ত। যদিও এখানকার স্নাতক পর্যায়ের মূল কোর্সগুলো ফরাসি ভাষায়, তবে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে এখন প্রচুর ইংরেজি মাধ্যম প্রোগ্রাম চালু হয়েছে।
সাশ্রয়ী টিউশন ফি এবং ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে মেধাবীদের জন্য উচ্চমাত্রার স্কলারশিপের সুবিধা থাকায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি উত্তর আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক। বিশেষ করে যারা উচ্চতর প্রযুক্তি বা স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য ‘এল এক্স’-এর একটি ডিগ্রি বিশ্বজুড়ে মর্যাদার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।











