কেন গ্লোবাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শীর্ষ তালিকায় মাদ্রিদ পলিটেকনিক?

ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী প্রযুক্তি বিদ্যাপীঠ ‘মাদ্রিদ পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়’ (Universidad Politécnica de Madrid – UPM) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৮শ শতাব্দীর রাজকীয় প্রকৌশল স্কুলগুলোতে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আজ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং মহাকাশ বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ন্যানোটেকনোলজির এক বিশাল গবেষণাগার।
ইউপিএম-এর ইতিহাস মানেই স্পেনের আধুনিকায়নের ইতিহাস। এর অধীনে থাকা স্কুলগুলো, যেমন—স্থাপত্য (ETSAM) বা মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে স্পেন ও ইউরোপের অবকাঠামো নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। মাদ্রিদ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এর চারটি প্রধান ক্যাম্পাস—মনক্লোয়া, মোন্তেগানেসদও, দক্ষিণ ক্যাম্পাস এবং শহরের কেন্দ্রস্থল—একসাথে কয়েক হাজার মেধাবীকে আগামীর কারিগর হিসেবে গড়ে তুলছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শক্তি হলো এর ব্যবহারিক শিক্ষা পদ্ধতি। এখানে থিওরির চেয়ে ল্যাবরেটরি এবং রিয়েল-লাইফ প্রজেক্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা কেবল বই পড়ে না, বরং সরাসরি বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্টের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে ইউপিএম থেকে পাশ করা একজন প্রকৌশলী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগেই পূর্ণাঙ্গ পেশাদার হিসেবে নিজেকে তৈরি করে ফেলেন।
মাদ্রিদ পলিটেকনিকের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালক হলো এর মহাকাশ গবেষণা (Aerospace Engineering)। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) এবং নাসা (NASA)-র বিভিন্ন মিশনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। এছাড়া সৌরশক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে ইউপিএম-এর গবেষণাগুলো বিশ্বজুড়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রকৌশলবিদ্যার আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে (QS World University Rankings) ইউপিএম নিয়মিতভাবে স্পেনের এক নম্বর এবং বিশ্বের শীর্ষ ৫০টি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজের জায়গা ধরে রাখে। বিশেষ করে মেকানিক্যাল, সিভিল এবং ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে এর কদর ইউরোপ ছাড়িয়ে এখন এশিয়া ও আমেরিকাতেও সমানভাবে সমাদৃত।
একনজরে মাদ্রিদ পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয় (UPM):
প্রতিষ্ঠা: ১৯৭১ (মূল স্কুলগুলো ১৮শ শতাব্দীর)।
অবস্থান: মাদ্রিদ, স্পেন।
শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ৩৫,০০০ জন।
র্যাঙ্কিং: প্রকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যায় স্পেনের শীর্ষস্থানীয় এবং কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা।
গবেষণা কেন্দ্র: ২০টিরও বেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অত্যাধুনিক সুপারকম্পিউটিং সুবিধা।
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব: ইউরোপের ‘অ্যাথেন্স’ (ATHENS) এবং ‘ইআইটি ডিজিটাল’ (EIT Digital) নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান মেগা প্রজেক্টগুলোর এই যুগে মাদ্রিদ পলিটেকনিক হতে পারে এদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এক স্বপ্নের গন্তব্য। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইউপিএম-এর ‘মাস্টার্স ইন স্মার্ট সিটিজ’ বা ‘ডেটা সায়েন্স’ প্রোগ্রামগুলোতে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। স্পেনে জীবনযাত্রার ব্যয় ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হওয়ায় বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তানদের জন্য এটি একটি সাশ্রয়ী কিন্তু বিশ্বমানের বিকল্প।
ভিসা প্রক্রিয়া ও ভাষাগত প্রস্তুতির কথা মাথায় রাখলে, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি পর্যায়ে ইউপিএম-এ প্রচুর প্রোগ্রাম এখন ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ইরাস্মাস মুন্ডাস এবং স্প্যানিশ সরকারি স্কলারশিপের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগও রয়েছে।











