প্রযুক্তির ‘পাওয়ারহাউস’ বার্সেলোনার ইউপিসি!

ইউরোপের অন্যতম সৃজনশীল শহর বার্সেলোনা কেবল ফুটবল বা পর্যটনের জন্য নয়, বরং বিশ্বমানের প্রকৌশল ও স্থাপত্য শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর মূলে রয়েছে ‘কাতালোনিয়া পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয় -ইউপিসি’ (Universitat Politècnica de Catalunya – UPC)। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠটি বর্তমানে ইউরোপের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
একটি সাধারণ পলিটেকনিক বা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্বখ্যাত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের গল্পটি ইউপিসির ক্ষেত্রে অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকৌশল স্কুলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরু থেকেই শিল্পকারখানার সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এখানকার শিক্ষাদান পদ্ধতি মূলত ‘প্রজেক্ট-বেসড লার্নিং’ বা প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে।
ইউপিসির ক্যাম্পাসগুলো বার্সেলোনা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে বিস্তৃত। প্রতিটি ক্যাম্পাসেই রয়েছে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি এবং গবেষণাগার। বিশেষ করে স্থাপত্যবিদ্যা (Architecture) এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ডকে বিশ্বের সেরা হিসেবে গণ্য করা হয়। বার্সেলোনা শহরের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর পেছনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেধার স্বাক্ষর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে।
ইউপিসি কেবল শিক্ষার্থী তৈরি করে না, এটি জ্ঞান সৃষ্টির এক বিশাল আধার। স্পেনের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের আবাসস্থল এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে অবস্থিত ‘ম্যারে নস্ট্রাম’ (MareNostrum) সুপারকম্পিউটারটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কম্পিউটার, যা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে জেনেটিক্স গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়া মহাকাশ বিজ্ঞান (Aerospace) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে ইউপিসির গবেষণাগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের জন্য এমন সব সুযোগ তৈরি করে, যা ইউরোপের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যেই জোটে। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় এটি নিয়মিতভাবে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
ইউপিসি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৭১ সাল (বিভিন্ন শতবর্ষী প্রকৌশল স্কুলের সমন্বয়ে)।
শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ৩০,০০০ শিক্ষার্থী এবং ৩,০০০-এর বেশি শিক্ষক ও গবেষক।
র্যাঙ্কিং: প্রকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যায় স্পেনের শীর্ষস্থানীয় এবং কিউএস (QS) র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
গবেষণা কেন্দ্র: ৩০টির বেশি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের অবস্থান।
শিল্প সংযোগ: প্রায় ৫,০০০-এর বেশি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি গবেষণা ও ইন্টার্নশিপ চুক্তি।
বাংলাদেশের উদীয়মান প্রকৌশলী ও স্থপতিদের জন্য ইউপিসি এক স্বর্ণালি সুযোগ। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে এখানে রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন।
ইউপিসিতে ভর্তির ক্ষেত্রে মেধার কদর যেমন বেশি, তেমনি পড়াশোনার খরচ অন্যান্য ইংরেজিভাষী দেশের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী। যদিও স্নাতক পর্যায়ে অনেক কোর্স কাতালান বা স্প্যানিশ ভাষায় হয়, তবে স্নাতকোত্তর (Masters) এবং পিএইচডি পর্যায়ের অধিকাংশ প্রোগ্রামই এখন ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বার্সেলোনার সমৃদ্ধ কর্মসংস্থান বাজার ইউপিসির গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সবসময়ই উন্মুক্ত।











