মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও উদ্যোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ১৩ লাখ ডলার। প্রথাগত রেমিট্যান্সের বাইরে এই নতুন বিনিয়োগ প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
প্রবাসীদের নতুন দিগন্ত
এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের ভূমিকা ছিল কেবল শ্রমিক বা সাধারণ পেশাজীবী হিসেবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই দৃশ্যপট এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে (জিসিসি) বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন না, বরং নিজেদের উপার্জিত অর্থ ও মেধা কাজে লাগিয়ে ওই দেশগুলোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন। এই পরিবর্তন শুধু প্রবাসীদের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. বিনিয়োগের পরিধি ও ক্ষেত্রঃ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমানে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বাড়ছে। প্রবাসীরা এখন আর কেবল ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোতেই সীমাবদ্ধ নন। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে রিয়েল এস্টেট, খুচরা ব্যবসা, প্রযুক্তি খাত, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রচুর মূলধন খাটাচ্ছেন। দেশটির আকর্ষণীয় ‘গোল্ডেন ভিসা’ এবং ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশ অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাকে আকৃষ্ট করছে।
২. পরিসংখ্যান ও অর্জনঃ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের স্থিতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি বিনিয়োগ এরই মধ্যে ৬ কোটি ১৩ লাখ ডলার এবং ওমানে ৩৭ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশি মালিকানাধীন সুপারশপ, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি এবং কার্গো সার্ভিস এখন অত্যন্ত পরিচিত।
৩. রেমিট্যান্স প্রবাহে এর প্রভাবঃ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। সম্প্রতি ওই অঞ্চলে নানা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও, পবিত্র ঈদুল ফিতর বা রমজানের মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। প্রবাসীরা যখন কোনো দেশে নিজের ব্যবসা বা স্থায়ী সম্পদ গড়ে তোলেন, তখন সেই দেশ থেকে নিয়মিত বৈধ উপায়ে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়, যা প্রকারান্তরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে।
৪. অর্থনীতিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জঃ
প্রবাসীদের এই বহির্বিশ্বে বিনিয়োগ বৃদ্ধি দেশের জন্য যেমন দারুণ সম্ভাবনা, তেমনি এতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক সময় বিদেশে উপার্জিত অর্থ বৈধ চ্যানেলে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব দেখা যায়। তবে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নতুন গৃহীত [Foreign Direct Investment (FDI) Incentive Scheme Policy, 2026] বা প্রণোদনা নীতিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে প্রবাসীরা আরও বেশি আস্থার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ব্যবসার সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি কেবল তাদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা শক্তির বহিঃপ্রকাশ। এই বিনিয়োগকে যদি যথাযথ সরকারি নীতি সহায়তা ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে লালন করা যায়, তবে তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আয়ের এক স্থায়ী ও শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হবে।









