নভেম্বর ৯, ২০২৬
#Uncategorized

মৃত্যুর পরও নির্মমতার মুখোমুখি !

২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রবাস থেকে ১৮ হাজার ৪২৯ জনের লাশ দেশে এসেছে। বিদেশের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন, প্রবাসে তাদের মৃত্যুর পরও মানসিক ও আর্থিক ভাবে চরম নির্মমতার মুখোমুখি হতে হয়। এখনো আমরা একটি নায্য, নিরাপদ ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। বাস্তবতা হলো গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি দালালচক্র, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যায় ঋণের বোঝা ও কর্মদক্ষতার অভাবে অনিশ্চয়তায় ভরা। একজন প্রবাসী বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রধান সমস্যাগুলোকে নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:

১. দাপ্তরিক জটিলতা ও কাগজের ঘাটতিঃ

  • দূতাবাসের অনুমতি: বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে ‘নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) বা অনাপত্তি পত্র সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক।
  • স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া: স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, হাসপাতাল এবং আদালতের ছাড়পত্র পেতে প্রচুর সময় লাগে।
  • বৈধ কাগজপত্রের অভাব: প্রবাসী যদি অবৈধ বা ‘আউট অফ স্ট্যাটাস’ হন, তবে তার সঠিক তথ্য ও পরিচয় নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়।
  • অস্বাভাবিক মৃত্যু: দুর্ঘটনা, হত্যা বা আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যু হলে ময়নাতদন্ত ও আইনি তদন্তের কারণে লাশ মর্গে মাসের পর মাস পড়ে থাকে।

২. উচ্চ বিমান ভাড়া ও আর্থিক সংকটঃ

  • পরিবহন খরচ: বিদেশের বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশে লাশ পাঠানোর বিমান ভাড়া অত্যন্ত আকাশচুম্বী।
  • তহবিলের অভাব: অনেক সময় নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি এই খরচ বহন করতে চায় না। ফলে বাধ্য হয়ে প্রবাসীরা নিজেরা চাঁদা তুলে বা দেশে স্বজনদের জমিজমা বন্ধক রেখে টাকা পাঠাতে হয়।
  • সহকর্মীদের ওপর চাপ: বাধ্য হয়ে মৃত ব্যক্তির সহকর্মীরা চাঁদা তুলে লাশের টিকিট কাটেন।

৩. নিয়োগকর্তা ও কোম্পানির অসহযোগিতাঃ

  • দায় এড়ানো: কর্মস্থলে বা আবাসনস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হলে অনেক কোম্পানি আইনি বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ এড়াতে লাশ পাঠানোর প্রক্রিয়া ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে নিয়োগকর্তা বা কফিল লাশ পাঠানোর খরচ বহন করতে রাজি হয় না।
  • যোগাযোগের অভাব: অনেক সময় স্পন্সর বা কোম্পানি বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ বা কাগজ আদান-প্রদান করতে গড়িমসি করে।

৪. দূতাবাসের তথ্য ও সহায়তার অভাবঃ

  • যোগাযোগের ঘাটতি: প্রবাসী ও তাদের পরিবারের বড় অভিযোগ, অনেক সময় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া পাওয়া যায় না।
  • ভাষা ও দূরত্বের সমস্যা: প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের পক্ষে শহরের দূতাবাসে গিয়ে দ্রুত যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৫. দীর্ঘ সময় লাগা ও বেওয়ারিশ দাফনঃ

  • মাসের পর মাস অপেক্ষা: সব নিয়মকানুন শেষ করে একটি লাশ দেশে পৌঁছাতে অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যায়।
  • বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন: পরিবার বা দূতাবাসের সাথে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব না হলে কিংবা খরচের টাকা জোগাড় না হলে অনেক সময় বিদেশের মাটিতেই মৃতদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে দেওয়া হয়।

৬. বিমানবন্দরে হয়রানি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে বিলম্বঃ

  • আর্থিক ক্ষতিপূরণ: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে বিমানবন্দরে লাশ দাফন ও পরিবহনের জন্য তাৎক্ষণিক ৩৫,০০০ টাকা দেওয়া হলেও মূল বিমা বা ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *