জি-৭ জোটে নতুন মেরুকরণ: শক্তিশালী হচ্ছে ব্রাসেলস-অটোয়া অক্ষ

বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে জি-৭ জোটে মেরুকরণ তীব্র রূপ ধারণ করেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের একতরফা বাণিজ্যনীতিকে পাশ কাটিয়ে এক ছাতার নিচে আসছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত বুধবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এক ঐতিহাসিক ভাষণে ইউরোপীয় কমিশন ও কানাডা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে অভিন্ন অক্ষ গঠনের ঘোষণা দেয়। মার্কিন শুল্কনীতি ও ভূরাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ব্রাসেলস ও অটোয়ার এই জোটবদ্ধ হওয়া বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ভারসাম্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে আরোপিত বাণিজ্যিক শুল্ক ও সুরক্ষাবাদী নীতি সাত দেশের অর্থনৈতিক জোট জি-৭-এর অভ্যন্তরীণ ঐক্যে চরম ফাটল ধরিয়েছে। কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপের ফলে ওয়াশিংটনের প্রতি বিশ্বস্ত মিত্রদের ভরসা তলানিতে ঠেকেছে। এর জবাবে আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখতে বিকল্প শক্তির কেন্দ্র গড়ে তুলতে বাধ্য হচ্ছে অটোয়া ও ব্রাসেলস।
ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির উপস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ব্রাসেলস-অটোয়া যৌথ উদ্যোগের রূপরেখা উপস্থাপন করেন। এই পদক্ষেপে জি-৭ জোটে মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে অর্থনৈতিক পরাশক্তির বদলে মধ্যম শক্তির গণতান্ত্রিক মিত্রদের এক প্ল্যাটফর্মে আনার জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
আমেরিকার ওপর ৭০ শতাংশ বাণিজ্য নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ তৈরি করতে ইউরোপের সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক বলয় তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে কানাডা। দুপক্ষ কেবল বাণিজ্য সুবিধা বা ‘সিইটিএ’ (CETA) চুক্তিতেই সীমিত থাকছে না; বরং সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আর্কটিক অঞ্চলের যৌথ সুরক্ষায় হাত মেলাচ্ছে।
কানাডার প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ ও ইউরোপের প্রযুক্তিগত দক্ষতার এই মেলবন্ধন জি-৭ সম্মেলনের টেবিলেও ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বহুমাত্রিক কৌশলের কারণে বিশ্বরাজনীতিতে জি-৭ জোটে মেরুকরণ একেবারে নতুন মাত্রায় রূপ নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক হুমকির মুখে কানাডাকে ইইউ-এর নীতিগত সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বিশ্ব কূটনীতিতে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। যদিও ইইউর মৌলিক সনদে এই পদের স্পষ্ট আইনি বিধান নেই, তবুও দুই তরফের এই আগ্রহ প্রমাণ করে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বাইরে নতুন কূটনৈতিক অক্ষ তৈরি হচ্ছে।
জি-৭ ফোরামে ওয়াশিংটন এতদিন যে একক প্রভাব বিস্তার করতো, ব্রাসেলস-অটোয়া অক্ষ সুসংগঠিত হলে সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যাবে। তবে ইউরোপের ২৭টি সদস্য দেশের সর্বসম্মত আইনি অনুমোদন আদায় এবং ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পাল্টাপদক্ষেপ সামলানো এই নতুন অক্ষের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।











