প্রবাসীদের সুরক্ষায় এবার যুক্ত হচ্ছে বিশেষ কাউন্সেলিং সেবা

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের শুধু অর্থনৈতিক অবদান নয়, তাদের ভেতরের নীরব কান্না ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিচ্ছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের তীব্র মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে কাউন্সেলিং সেবার ব্যাপক প্রসারের উদ্যোগ নিয়েছে।
আমাদের রেমিট্যান্সের গ্রাফ যত ঊর্ধ্বমুখী হয়, প্রবাসীদের মনের ভেতরের ক্ষতগুলো ততটাই আড়ালে পড়ে যায়। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়া, মাথার ওপর ঋণের বোঝা, প্রতিকূল আবহাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে প্রতিনিয়ত তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যান একজন প্রবাসী। পরিবারের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিতে গিয়ে অনেকেই একপর্যায়ে মারাত্মক অবসাদে ভোগেন, যার চরম পরিণতি হিসেবে অনেক সময় আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটে।
সাংবাদিকতার দীর্ঘ দেড় দশকে বহু প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরার তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছি, মৃত্যুর কারণ হিসেবে যতটা শারীরিক অসুস্থতা দায়ী, তার চেয়েও বেশি দায়ী ছিল মানসিক নিঃসঙ্গতা। এই নীরব ঘাতক থেকে প্রবাসীদের বাঁচাতে দীর্ঘদিনের উদাসীনতা কাটিয়ে অবশেষে চালু হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও দূতাবাসে মিলবে মনের যত্ন
নতুন এই বিশেষ উদ্যোগের আওতায় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় বড় শ্রমবাজারগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে একজন করে সার্বক্ষণিক পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া দূর-দূরান্তে থাকা কর্মীরা যাতে সহজেই সেবা পেতে পারেন, সে জন্য একটি ২৪ ঘণ্টা সচল ডিজিটাল কাউন্সেলিং অ্যাপ এবং হটলাইন নম্বর চালু করা হচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক অসুস্থতা প্রকাশ করা যতটা সহজ, আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যার কথা বলা ততটাই কঠিন। প্রবাসীরা যেন লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে নিজেদের সংকটের কথা মন খুলে বলতে পারেন, সে জন্য নাম-পরিচয় গোপন রেখে কাউন্সেলিং করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সাথে বিদেশে যাওয়ার আগে যে বাধ্যতামূলক ‘প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন’ দেওয়া হয়, সেখানেও এখন থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ও চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখানো হবে।
প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল পদক্ষেপসমূহ:
দূতাবাসে ‘মন ভালো করার’ বুথ: প্রধান প্রধান কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সরাসরি কাউন্সিলরের সাথে কথা বলার জন্য বিশেষ বুথ স্থাপন।
বিনামূল্যে চব্বিশ ঘণ্টা হটলাইন: যেকোনো দেশ থেকে যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ পাওয়ার জন্য টেলি-কাউন্সেলিং সুবিধা।
প্রাক-যাত্রায় মানসিক প্রস্তুতি: বিএমইটি (BMET) ব্রিফিং সেন্টারে বিদেশ যাওয়ার আগেই মানসিক চাপ মোকাবিলার বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান।
নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে বিশেষ নজর: বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন দূতাবাসের সেফহোমে আশ্রয় নেন, তাদের দ্রুত মানসিক ট্রমা কাটিয়ে তুলতে বিশেষ থেরাপির ব্যবস্থা।
এই কাউন্সেলিং সুবিধার প্রসার তখনই সফল হবে, যখন এর সঠিক প্রচার নিশ্চিত করা যাবে। অনেক সাধারণ শ্রমিক হয়তো জানেনই না যে মানসিক অবসাদ একটি রোগ এবং এর চিকিৎসা আছে। তাই দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে শ্রমিকদের মেস ও কর্মক্ষেত্রগুলোতে এই সেবার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ মনের একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধাই দেশের আসল সম্পদ।










