প্রবাসীদের জন্য টাকা পাঠানোর সেরা সময় কোনটি?

বিশ্ববাজারে ডলারের ক্রমবর্ধমান দর এবং দেশের ভেতরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড দর এবং সাথে সরকারি প্রণোদনা মিলে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঊর্ধ্বমুখী বাজার কি আরও বাড়বে, না কি এখনই টাকা পাঠানোর সেরা সময়?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মুদ্রাবাজারে ডলারের সংকট ও টাকার মান কমে যাওয়া নিয়ে আলোচনা চললেও, প্রবাসীদের জন্য এটি একটি ভিন্ন বার্তা বয়ে এনেছে। আগে যেখানে এক ডলারের বিনিময়ে ১০০ বা ১০৫ টাকা পাওয়া যেত, বর্তমান বাজারে বিভিন্ন ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতে সেই দর অনেক ক্ষেত্রে ১১৫ থেকে ১২০ টাকার ঘর স্পর্শ করছে।
এর সাথে সরকারের দেওয়া ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা যোগ করলে প্রাপ্ত অর্থের অংকটি দাঁড়ায় আরও লোভনীয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের এই বাড়তি রেট মূলত আমদানির চাপ এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল। তবে গত কয়েক সপ্তাহের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক বা ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সরকারি এবং খোলা বাজারের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে, যা প্রবাসীদের হুন্ডির মতো অবৈধ পথ ছেড়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে উৎসাহিত করছে।
তবে মুদ্রাবাজারের এই অস্থিরতায় অনেক প্রবাসী ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and See) নীতি গ্রহণ করেছেন। তারা ভাবছেন ডলারের দাম আরও বাড়বে কি না। এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে, মুদ্রার দর সবসময় একমুখী থাকে না।
সরকার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে যেকোনো সময় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, ফলে হঠাৎ করে রেট কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই বড় অংকের অর্থ জমিয়ে না রেখে কিস্তিতে বা নিয়মিত বিরতিতে টাকা পাঠানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশেষ করে যারা পরিবারের দৈনন্দিন খরচ বা দেশে বিনিয়োগের জন্য টাকা পাঠান, তাদের জন্য বর্তমান সময়টিকে ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ বা সুবর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কারণ টাকার মান কমে যাওয়ায় বর্তমানে সমপরিমাণ ডলারে দেশের বাজারে আগের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য বা সেবা ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রবাসী ভাইদের জন্য বিশেষ কিছু তথ্য ও পরামর্শ:
বিনিময় হার যাচাই: টাকা পাঠানোর আগে অন্তত ৩-৪টি স্বীকৃত ব্যাংক বা মানি ট্রান্সফার অ্যাপের রেট তুলনা করুন।
সরকারি প্রণোদনা: নিশ্চিত করুন আপনি আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাচ্ছেন কি না; বৈধ চ্যানেলে পাঠালে এটি আপনার পাওনা।
ছুটির দিন বর্জন: সাধারণত সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ থাকায় রেট কিছুটা স্থিতিশীল বা কম থাকে; কর্মদিবসে লেনদেন করা লাভজনক হতে পারে।
সঞ্চয়ে মনোযোগ: ডলারের বাড়তি রেটের সুবিধা নিয়ে সেই অর্থ কেবল খরচ না করে ‘প্রবাসী সঞ্চয় বন্ড’ বা ‘পেনশন স্কিমে’ বিনিয়োগ করা দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
অবৈধ পথ বর্জন: হুন্ডিতে রেট সামান্য বেশি মনে হলেও এতে জীবনের ঝুঁকি ও আইনি জটিলতা থাকে; বৈধ পথে পাঠানো অর্থই দেশের প্রকৃত শক্তি।
পরিশেষে, ডলারের রেট বৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি প্রবাসীদের হাড়ভাঙা খাটুনির বাড়তি মূল্যায়নের একটি সুযোগ। তবে বাজার সবসময় অনিশ্চিত।
তাই সর্বোচ্চ দর পাওয়ার আশায় মাসের পর মাস অর্থ আটকে না রেখে, বর্তমানের অনুকূল পরিস্থিতির সুবিধা নেওয়াটাই শ্রেয়।











